← Back
BREAKING
🔴 ঈদ পরবর্তী ফুটবল উন্মাদনা: আজ মাঠে নামছে 'ফ্যালকন ১৯' বনাম 'আলোকিত ১৫'🔴 খেলার শেষ মুহূর্তে আসিফের পেনাল্টি গোল: 'আলোকিত ১৫'-কে হারিয়ে 'ফ্যালকন ১৯'-এর নাটকীয় জয়🔴 Ex-IGP Benazir Ahmed Arrested in Dubai: The Fall of a Police Emperor and the Multi-Billion Taka Global Asset Trail🔴 সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ দুবাইয়ে গ্রেফতার: অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় দেশে ফেরানোর উদ্যোগ🔴 বেনজীরকে ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে দুদক: ৩০ দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদনের তাগিদ দুবাইয়ের

GenZ Frontier News Header

‘টাঙ্গাইলের কাস্ত্রো’ বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী: এক গেরিলা কিংবদন্তির অবিশ্বাস্য মুক্তিযুদ্ধ

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | ১৬ জুন ২০২৬

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে কিছু নাম সাহস, আত্মত্যাগ এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রতীক হয়ে আছে। সেই নামগুলোর অন্যতম বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী, যিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে “Castro of Tangail” এবং সাধারণ মানুষের কাছে “বাঘা সিদ্দিকী” নামে পরিচিত ছিলেন। কোনো নিয়মিত সামরিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই, সীমিত অস্ত্র ও সম্পদ নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন প্রায় ১৮ হাজার সদস্যের এক শক্তিশালী গেরিলা বাহিনী, যা পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে টাঙ্গাইল ও আশপাশের বিশাল এলাকা দীর্ঘ সময় ধরে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছিল।

২৫ মার্চের কালরাত এবং প্রতিরোধের সূচনা

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ চালিয়ে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর গণহত্যা শুরু করলে সারাদেশের মতো টাঙ্গাইলেও ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। সেই রাতেই তরুণ কাদের সিদ্দিকী কয়েকজন পুলিশ সদস্য ও স্থানীয় যুবকদের নিয়ে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন।

মাত্র কয়েকটি .303 Lee Enfield রাইফেল এবং Breda Light Machine Gun নিয়ে তিনি টাঙ্গাইল সার্কিট হাউসে অবস্থান নেওয়া পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। যদিও প্রথম আক্রমণ ভারী মেশিনগানের মুখে ব্যর্থ হয়, তবুও তিনি পিছু হটেননি। একই রাতে আরও দুই দফা আক্রমণ চালিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করেন এবং সাময়িকভাবে টাঙ্গাইল মুক্ত করতে সক্ষম হন।

স্বাধীনতার ঘোষণা ছড়িয়ে দেন টাঙ্গাইলে

চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারের খবর কাদের সিদ্দিকীর কাছে পৌঁছে যায়। স্থানীয়ভাবে রেকর্ড করা সেই ঘোষণা তিনি টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকায় প্রচার করেন। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আরও জোরালো হয়ে ওঠে এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের আগ্রহ বাড়তে থাকে।

গড়ে ওঠে ‘টাঙ্গাইল সংগ্রাম পরিষদ’

মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়েই আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী, স্থানীয় জনগণ এবং তাঁর রাজনৈতিক মেন্টর আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর সহযোগিতায় গঠিত হয় “টাঙ্গাইল সংগ্রাম পরিষদ”। বিদ্রোহী বাঙালি সেনা কর্মকর্তা ও সৈনিকরাও তাঁর নেতৃত্বে যোগ দিতে শুরু করেন।

টাঙ্গাইলের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা থেকে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা উত্তোলন করা হয়। খুব দ্রুতই তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।

১৮ হাজার সদস্যের দুর্ধর্ষ গেরিলা বাহিনী

যখন অনেক মুক্তিযোদ্ধা ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা নিচ্ছিলেন, তখন কাদের সিদ্দিকী দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের অভ্যন্তরেই থেকে যুদ্ধ চালিয়ে যান। সেপ্টেম্বর ১৯৭১ নাগাদ তিনি প্রায় ১৮ হাজার সদস্যের একটি সুসংগঠিত গেরিলা বাহিনী গড়ে তুলতে সক্ষম হন।

তাঁর বাহিনী টাঙ্গাইল ও আশপাশের প্রায় ১,৫০০ বর্গমাইল এলাকা কার্যত নিয়ন্ত্রণে রাখে। এই অঞ্চল মুক্তাঞ্চল হিসেবে পরিচিতি পায় এবং পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

‘বাঘা সিদ্দিকী’ থেকে ‘Castro of Tangail’

স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি ছিলেন “বাঘা সিদ্দিকী”। আর তাঁর দাড়ি, পোশাক ও গেরিলা নেতৃত্বের ধরন দেখে ভারতীয় সেনাবাহিনী তাঁকে কিউবার বিপ্লবী নেতা Fidel Castro-এর সঙ্গে তুলনা করে “Castro of Tangail” উপাধি দেয়।

এই উপাধি পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

মাতিকাটা অভিযানে পাকিস্তানি জাহাজ ধ্বংস

১৯৭১ সালের ১২ আগস্ট মাতিকাটা গ্রামে তাঁর বাহিনী পাকিস্তানি বাহিনীর দুটি অস্ত্রবাহী জাহাজ ধ্বংস করে। এই অভিযানে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস হয়, যার মূল্য সে সময় আনুমানিক ২১ কোটি পাকিস্তানি রুপি বলে উল্লেখ করা হয়।

এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সফল গেরিলা অভিযান, যা পাকিস্তানি বাহিনীর সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা দেয়।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে যৌথ অভিযান

যুদ্ধে আহত হওয়ার পর তিনি ভারতের মেঘালয়ের তুরায় চিকিৎসা নেন। সেখানে তাঁর সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সাক্ষাৎ হয়।

পরে ভারতীয় সেনাবাহিনী তাঁর বাহিনীকে আরও প্রশিক্ষণ দেয় এবং “বাংলা ব্রিগেড” গঠনে সহায়তা করে। 101 Communication Zone-এর অগ্রযাত্রায় তাঁর বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করে এবং ঢাকার দিকে অগ্রসর হওয়ার পথ সুগম করে।

টাঙ্গাইল প্যারাড্রপ এবং চূড়ান্ত বিজয়

১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর টাঙ্গাইলে ভারতীয় প্যারাট্রুপারদের ঐতিহাসিক অবতরণের সময় কাদের সিদ্দিকীর বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পোংলি ব্রিজ এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করতে তাঁর যোদ্ধারা সরাসরি অংশগ্রহণ করেন।

এই অভিযানের সাফল্য ঢাকার দিকে মিত্রবাহিনীর দ্রুত অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করে এবং পাকিস্তানি বাহিনীর পতন ত্বরান্বিত করে।

স্বাধীনতার পর বিতর্ক ও আত্মসমর্পণ

স্বাধীনতার পর ২০ ডিসেম্বর একটি জনসভায় তাঁর অনুসারীদের হাতে কয়েকজন রাজাকার নিহত হওয়ার ঘটনা ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। পরবর্তীতে তিনি আত্মগোপনে যান এবং পরে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে অস্ত্র সমর্পণ করেন।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি পুনরায় জাতীয় স্বীকৃতি ও সম্মান লাভ করেন।

বীর উত্তমের উত্তরাধিকার

মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব, নেতৃত্ব এবং অবদানের জন্য আব্দুল কাদের সিদ্দিকীকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘বীর উত্তম’ প্রদান করা হয়।

আজও তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জীবন্ত কিংবদন্তি। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গেরিলা যুদ্ধ, সাহসী অভিযান এবং আত্মত্যাগের গল্প নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করতে অনুপ্রাণিত করে।

related Tage kader siddique