← Back

GenZ Frontier News Header

জিপিএস ছাড়াই নিখুঁত গন্তব্যে! উন্মোচিত হলো কবুতরের শরীরের গভীরে লুকিয়ে থাকা ‘বায়োলজিক্যাল কম্পাস’-এর রহস্য

প্রতিবেদক: শর্মি খন্দকার (বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি) | ০৫ জুন ২০২৬ (ছবি সূত্র: রয়টার্স)

আধুনিক এই যুগে আমরা কোথাও যাওয়ার জন্য স্মার্টফোনের ম্যাপ বা জিপিএস (GPS) নেভিগেশনের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে বা স্যাটেলাইট সিগন্যাল হারিয়ে গেলে আমাদের পথ চেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কিন্তু পৃথিবীর বুকে এমন কিছু প্রাণী রয়েছে, যাদের পথ চেনার জন্য কোনো কৃত্রিম প্রযুক্তির প্রয়োজন হয় না। নিখুঁতভাবে পথ চেনার ক্ষেত্রে এমন প্রাণীদের মধ্যে কবুতরের জুড়ি মেলা সত্যিই ভার। শত শত মাইল দূর থেকে, সম্পূর্ণ অচেনা কোনো স্থান থেকে ছেড়ে দিলেও, কোনো ম্যাপ বা ইন্টারনেট ছাড়াই এরা অনায়াসে চেনা ঠিকানায় ফিরে আসতে পারে।

শত শত বছর ধরে মানুষ কবুতরের এই অদ্ভুত ও ঐশ্বরিক ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে চিঠি আদান-প্রদান করেছে। প্রাচীনকালের রাজা-বাদশাহদের সংবাদ আদান-প্রদান থেকে শুরু করে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও অত্যন্ত গোপনীয় ও জরুরি বার্তা পৌঁছানোর কাজে এই ‘হোমিং পিজিয়ন’ বা বার্তাবাহক কবুতর ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু তাদের শরীরের ঠিক কোথায় এই প্রাকৃতিক জিপিএস বা কম্পাস লুকিয়ে আছে, তা আধুনিক বিজ্ঞানের কাছে এত দিন এক বিশাল ও গভীর রহস্য হয়ে ছিল। অবশেষে দীর্ঘ গবেষণার পর জার্মানির একদল বিজ্ঞানী কবুতরের শরীরের ভেতরে থাকা সেই অমীমাংসিত প্রাকৃতিক কম্পাসের সন্ধান পেয়েছেন।

প্রযুক্তিকে হার মানানো এক প্রাকৃতিক জিপিএস

বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরেই এই ধারণা করে আসছিলেন যে, অন্যান্য পরিযায়ী পাখি বা প্রাণীর মতো কবুতরও পথ চেনার জন্য মূলত পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র বা ম্যাগনেটিক ফিল্ডের সাহায্য নিয়ে থাকে। পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর চৌম্বকীয় টানকে অনুভব করে এরা নিজেদের মস্তিষ্কে একটি অদৃশ্য ম্যাপ তৈরি করে নেয়। কিন্তু প্রশ্ন ছিল— শরীরের ঠিক কোন অঙ্গের মাধ্যমে তারা এই চৌম্বকীয় সংকেত ধরতে পারে?

কেউ কেউ ধারণা করতেন কবুতরের চোখের রেটিনায় এই সেন্সর রয়েছে, আবার কারও ধারণা ছিল তাদের ঠোঁটের উপরিভাগে থাকা কোনো স্নায়ু হয়তো এই কাজ করে। তবে অতীতের সব ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব বন (University of Bonn) এবং ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট অব অ্যানিমেল বিহেভিয়ারের (Max Planck Institute of Animal Behavior) একদল গবেষক এবার এ বিষয়ে একেবারে অকাট্য ও যুগান্তকারী প্রমাণ খুঁজে পেয়েছেন।

মস্তিষ্ক বা চোখ নয়, কম্পাস লুকিয়ে আছে যকৃতে!

ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও প্রধান বিজ্ঞানী মার্টিন উইকেলস্কি এই আবিষ্কার সম্পর্কে অত্যন্ত চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, “পাখিদের পথ চেনার এই অসামান্য সক্ষমতাকে আমরা এত দিন তাদের কেবলই সহজাত প্রবৃত্তি, বংশগত বৈশিষ্ট্য বা মনের কোনো বিশেষ অনুভূতি বলে ভাবতাম। কিন্তু আমাদের সাম্প্রতিক গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, এর পেছনে অত্যন্ত চমৎকার এবং সুনির্দিষ্ট ভৌত ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে।”

সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয় হলো, বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন কবুতরের এই অভ্যন্তরীণ কম্পাসটি তাদের মস্তিষ্ক, চোখ বা ঠোঁটে নয়, বরং লুকিয়ে আছে তাদের লিভার বা যকৃতের একেবারে গভীর কোষে! গবেষণায় দেখা গেছে, কবুতরের লিভারে প্রচুর পরিমাণে আয়রন বা লৌহকণা সঞ্চিত থাকে। আর এই আয়রনই তাদের দিক নির্ণয়ের মূল হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।

ম্যাক্রোফেজ: রোগ প্রতিরোধের কোষ যখন পথপ্রদর্শক

গবেষণায় অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, কবুতরের লিভারে থাকা বিশেষ একধরনের কোষ এই পথ চেনার কাজে প্রধান ভূমিকা পালন করে। এই কোষগুলোকে জীববিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ম্যাক্রোফেজ’ (Macrophage)। সাধারণত প্রাণিদেহে ম্যাক্রোফেজ হলো একধরনের বিশেষ শ্বেত রক্তকণিকা বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা–সম্পন্ন কোষ (Immune cells), যাদের মূল কাজ হলো শরীরের ভেতরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা মৃত কোষগুলোকে ধ্বংস করা।

কিন্তু বিজ্ঞানীরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন, কবুতরের লিভারের এই আয়রনবোঝাই ম্যাক্রোফেজগুলো শুধু রোগ প্রতিরোধই করছে না, বরং এরা দিক নির্ণয়ের সেন্সর হিসেবেও কাজ করছে। প্রাণীদের এই নেভিগেশন বা পথ চেনার ক্ষমতা প্রকৃতির অন্যতম আকর্ষণীয় একটি ঘটনা। যদি সত্যিই শরীরের ইমিউন বা রোগ প্রতিরোধকারী কোষগুলো পাখিদের দিক নির্ণয়ে সাহায্য করে থাকে, তবে তা চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং প্রাণিবিজ্ঞানে প্রাণীদের নেভিগেশন সম্পর্কে আমাদের চিরচেনা ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দেবে।

কোয়ান্টাম ফিজিক্স এবং সুপার-প্যারা-ম্যাগনেটিজম

কবুতরের দিক নির্ণয়ের বিষয়টি শুধু জীববিজ্ঞানের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি আক্ষরিক অর্থেই পদার্থবিজ্ঞানের এক বিস্ময়। গবেষণায় দেখা যায়, এই আয়রন-সমৃদ্ধ ম্যাক্রোফেজ কোষগুলোর মধ্যে একটি বিশেষ ও অত্যন্ত বিরল কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্য রয়েছে। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এই বিশেষ অবস্থাকে বলা হয় ‘সুপার–প্যারা–ম্যাগনেটিজম’ (Super-paramagnetism)।

এই সুপার-প্যারা-ম্যাগনেটিক কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্যটির কারণেই ম্যাক্রোফেজগুলো পৃথিবীর অত্যন্ত সূক্ষ্ম চৌম্বক ক্ষেত্রের পরিবর্তনেও সাড়া দিতে পারে। সোজা কথায়, এই কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্যটি কবুতরের লিভারের ভেতরে আক্ষরিক অর্থেই একটি দিকনির্ণয়কারী কম্পাসের কাঁটার মতো কাজ করে। পৃথিবীর চৌম্বকীয় মেরুর দিকে এই কোষগুলো সংবেদনশীল হয়ে ওঠে, যা কবুতরকে বুঝতে সাহায্য করে সে ঠিক কোন অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশে অবস্থান করছে।

লিভার থেকে মস্তিষ্কে সিগন্যাল ট্রান্সমিশন

এখন প্রশ্ন হলো, লিভারে থাকা কম্পাস কীভাবে মস্তিষ্ককে দিক নির্দেশ করে? বিজ্ঞানীরা অত্যাধুনিক ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে কবুতরের লিভারের টিস্যু বা কলা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা করেছেন। সেখানে তারা দেখতে পান, লিভারের সেই বিশেষ ম্যাক্রোফেজ কোষগুলোর সঙ্গে কবুতরের স্নায়ুতন্ত্রের কিছু অতি সূক্ষ্ম স্নায়ুতন্তু (Nerve fibers) সরাসরি যুক্ত রয়েছে।

এই স্নায়ুতন্তুগুলো মূলত একটি অপটিক্যাল ফাইবার কেবলের মতো কাজ করে। লিভারের ভেতরে থাকা প্রাকৃতিক কম্পাসটি পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র থেকে যে চৌম্বকীয় সংকেত বা ডেটা সংগ্রহ করে, এই স্নায়ুতন্তুগুলো অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সেই সংকেতকে সরাসরি কবুতরের মস্তিষ্কে পৌঁছে দেয়। মস্তিষ্ক তখন সেই সংকেতকে প্রসেস করে একটি থ্রিডি (3D) ম্যাপ তৈরি করে এবং কবুতর খুব সহজেই বুঝতে পারে তাকে কোন দিকে উড়তে হবে।

ভবিষ্যতের গবেষণায় নতুন দিগন্ত

কবুতরের এই ‘বায়োলজিক্যাল জিপিএস’-এর রহস্য উন্মোচন বিজ্ঞানীদের জন্য একটি বিশাল মাইলফলক। এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে প্রকৃতি তার নিজস্ব উপায়ে কতটা নিখুঁত এবং উন্নত প্রযুক্তির অধিকারী। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই গবেষণার ফলাফল শুধু প্রাণিবিজ্ঞানীদেরই সাহায্য করবে না, বরং আগামী দিনে উন্নত নেভিগেশন সিস্টেম, কোয়ান্টাম সেন্সর এবং বায়ো-মিমিক্রি (Biomimicry) প্রযুক্তি উদ্ভাবনে ইঞ্জিনিয়ারদেরও নতুন পথের সন্ধান দেবে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে কবুতরের এই সুপার-প্যারা-ম্যাগনেটিজম ধারণা ব্যবহার করে মানুষ এমন কোনো কৃত্রিম সেন্সর তৈরি করতে সক্ষম হবে, যা স্যাটেলাইট সিগন্যাল ছাড়াই পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে নিখুঁতভাবে দিক নির্ণয় করতে পারবে।