
সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ দুবাইয়ে গ্রেফতার: অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় দেশে ফেরানোর উদ্যোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক | GenZ Frontier | ১৫ জুন ২০২৬
অবৈধ সম্পদ অর্জন ও দুর্নীতির মামলায় পলাতক পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেফতার হয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলার প্রেক্ষিতে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ ও সহযোগিতায় দুবাই সিটি পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে পলাতক থাকার পর তার এই গ্রেফতার দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
রোববার (১৪ জুন) পুলিশ সদর দফতরের একটি দায়িত্বশীল সূত্র GenZ Frontier-কে এই গ্রেফতারের তথ্য নিশ্চিত করেছে। সূত্রটি জানায়, ইন্টারপোলের ইন্টেলিজেন্স শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে সাবেক এই আইজিপির অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর গত ১২ জুন বাংলাদেশের পুলিশ কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করে ইন্টারপোল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও এই গ্রেফতারের তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘প্রত্যার্পণ চুক্তির আওতায় কূটনৈতিক চ্যানেলে তাকে দেশে ফেরত আনার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব পাঠানো হবে। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়, তা সে যত ক্ষমতাধর ব্যক্তিই হোক না কেন।’
🏃 দেশত্যাগ ও আত্মগোপনের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগেই, দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান বেনজীর আহমেদ। এর আগে তিনি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পদে (ডিএমপি কমিশনার, র্যাব মহাপরিচালক এবং আইজিপি) দোর্দণ্ড প্রতাপের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
💰 দুদকের মামলা ও সম্পদের পাহাড়
১১ কোটি টাকার বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন দুদকের উপপরিচালক হাফিজুল ইসলাম। দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত বছরের ৩০ নভেম্বর বেনজীরের বিরুদ্ধে আদালতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়।
মামলার অভিযোগপত্রের তথ্য অনুযায়ী: * ঘোষিত সম্পদ: বেনজীর তার দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে ৬ কোটি ৪৫ লাখ ৩৭ হাজার ৩৬৫ টাকার স্থাবর এবং ৫ কোটি ৭৪ লাখ ৮৯ হাজার ৯৬৬ টাকার অস্থাবর সম্পদের ঘোষণা দিয়েছিলেন। * তদন্তে প্রাপ্ত সম্পদ: কিন্তু দুদকের নিবিড় তদন্তে তার নামে ৭ কোটি ৫২ লাখ ৬৮ হাজার ৯৮৭ টাকার স্থাবর এবং ৮ কোটি ১৫ লাখ ৩১ হাজার ২৬৪ টাকার অস্থাবর সম্পদের গোপন তথ্য বেরিয়ে আসে। * অবৈধ সম্পদের পরিমাণ: তদন্তে মোট ১৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকার সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পাওয়া গেলেও তার বৈধ আয়ের উৎস ছিল মাত্র ৬ কোটি ৫৯ লাখ ৪২ হাজার ৬৬৮ টাকা। পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয় বাদ দিলে তার নিট সঞ্চয় দাঁড়ায় ৪ কোটি ৬৩ লাখ ৫৬ হাজার ৬৭৫ টাকা। হিসাব অনুযায়ী, তার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের পরিমাণ ১১ কোটি ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৫৭৬ টাকা।
অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্জিত এসব অর্থের অবৈধ উৎস, প্রকৃতি ও মালিকানা গোপন করতে তিনি বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও যৌথ মূলধনি প্রতিষ্ঠানে তা বিনিয়োগ, স্থানান্তর ও রূপান্তর করেছেন।
⚖️ বিচারিক কার্যক্রম ও পরোয়ানা
গত ৮ মার্চ আদালত মামলার অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে সাবেক এই ক্ষমতাধর আইজিপির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। এরপর গত ৩ মে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এই চাঞ্চল্যকর মামলার আনুষ্ঠানিক বিচারকাজ শুরু হয়। পলাতক অবস্থাতেই তার অনুপস্থিতিতে বিচারকার্য চলছিলো।
🚔 ক্ষমতা, প্রভাব ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা
১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হিসেবে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেওয়া বেনজীর আহমেদ একসময় ছিলেন দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি সন্ত্রাস দমন বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীর সদস্য হিসেবে বসনিয়া ও কসোভোতে কাজ করেছেন।
২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তিনি এলিট ফোর্স র্যাবের মহাপরিচালক ছিলেন। এরপর ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তবে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় কলঙ্কজনক অধ্যায় রচিত হয় ২০২১ সালের ডিসেম্বরে। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে র্যাব ও এর সাবেক-বর্তমান ৭ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ দফতর (ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট)। সেই নিষেধাজ্ঞার তালিকায় র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক হিসেবে বেনজীর আহমেদের নামও স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল।
📰 অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা: 'আলাদীনের চেরাগ'
২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৫৯ বছর পূর্ণ হওয়ায় সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী অবসরে যান তিনি। অবসরের পরপরই তার অবৈধ সম্পদের সাম্রাজ্য নিয়ে গণমাধ্যমে একের পর এক বোমা ফাটানো খবর প্রকাশিত হতে থাকে।
জাতীয় দৈনিক কালের কণ্ঠ ‘বেনজীরের ঘরে আলাদীনের চেরাগ’ ও ‘বনের জমিতে বেনজীরের রিসোর্ট’ শিরোনামে দুই পর্বের চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। * প্রথম পর্ব (৩১ মার্চ ২০২৪): প্রতিবেদনে উঠে আসে, বেনজীরের পরিবারের মালিকানায় রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ বিঘা জমির ওপর নির্মিত বিলাসবহুল ইকো রিসোর্ট। এর পাশে আরও ৮০০ বিঘা জমি, পাঁচ তারকা হোটেলের ২ লাখ শেয়ার এবং ঢাকার বসুন্ধরায় সাড়ে তিন হাজার বর্গফুটের আলিশান ফ্ল্যাট রয়েছে তাদের নামে। * দ্বিতীয় পর্ব (২ এপ্রিল ২০২৪): ভাওয়াল গড় ইউনিয়নের নলজানী গ্রামে ১৬০ বিঘা জমির ওপর নির্মিত ভাওয়াল রিসোর্টে বনের ২০ বিঘা জমি দখলের চিত্র উঠে আসে। এছাড়াও দুবাইয়ে শতকোটি টাকার হোটেল ব্যবসা, সিঙ্গাপুরে সোনার ব্যবসা এবং থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় বিপুল সম্পত্তির তথ্য ফাঁস হয়।
🗣️ আত্মপক্ষ সমর্থন ও পলায়ন
গণমাধ্যমে এসব প্রতিবেদন প্রকাশের পর গত ২০ এপ্রিল নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন বেনজীর আহমেদ। সেখানে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, তার পরিবারের সম্পদ বৈধ এবং ট্যাক্স ফাইলে উল্লেখ রয়েছে। কেউ অবৈধ সম্পত্তি প্রমাণ করতে পারলে তা বিনা পয়সায় লিখে দেওয়ারও চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন তিনি।
তবে সেই চ্যালেঞ্জের কয়েক সপ্তাহ পরই, মে মাসে অত্যন্ত গোপনে তিনি দেশত্যাগ করেন। ধারণা করা হচ্ছে, সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়া হয়ে তিনি অবশেষে সংযুক্ত আরব আমিরাতে থিতু হওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
🔄 পরবর্তী পদক্ষেপ ও প্রত্যাবাসন
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুবাই থেকে তাকে ফিরিয়ে আনা সময়সাপেক্ষ হলেও অসম্ভব নয়। বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে আইনি সহযোগিতার বিষয়ে যে বোঝাপড়া রয়েছে, সরকার সেটি কাজে লাগিয়ে খুব শিগগিরই তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই গ্রেফতার প্রমাণ করে যে, দুর্নীতির শেকড় যত গভীরেই হোক না কেন, জবাবদিহিতার আওতা থেকে চিরকাল পালিয়ে থাকা সম্ভব নয়।
ট্যাগস:


