ছবি: গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানের সময় প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন (ফাইল ছবি)।
গেন্ডারিয়ার অস্ত্রকাণ্ড: ‘আত্মরক্ষার্থেই লাইসেন্সকৃত অস্ত্র প্রদর্শন’, গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে খণ্ডিত সংবাদ প্রচারের অভিযোগ প্রতিমন্ত্রী ইশরাকের
পলিটিকাল ডেস্ক | GenZ Frontier | ১৯ অক্টোবর, ২০২৬
ঢাকা — রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেললাইনসংলগ্ন এলাকায় মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ এবং প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্কের জবাবে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েছেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। তাঁর দাবি, একটি স্পর্শকাতর অভিযানের মাত্র কয়েক সেকেন্ডের দৃশ্যকে পুঁজি করে কতিপয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খণ্ডিত ও বিকৃত সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে জনমনে পরিকল্পিত বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।
রোববার (১৮ অক্টোবর, ০৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ) মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর প্রেস কর্মকর্তা মাহফুজ কবির মুক্তা স্বাক্ষরিত এক দাপ্তরিক বিবৃতিতে পুরো ঘটনার প্রেক্ষাপট, পূর্ববর্তী প্রশাসনিক উদ্যোগ এবং আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র প্রদর্শনের সুনির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করা হয়।
গেন্ডারিয়ার মাদক পরিস্থিতি ও পূর্ববর্তী দাপ্তরিক উদ্যোগ
বিবৃতিতে জানানো হয়, ঢাকা-৬ আসনের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর, মুন্সিটেক, করাতিটোলা ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবাধে মাদক কেনাবেচা এবং স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার নিয়ে এলাকাবাসীর কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেয়ে আসছিলেন ইশরাক হোসেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এই জনপদটি মাদক সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রধান ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়।
প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, গত জুন মাসে ওই এলাকায় মাদক-সংক্রান্ত এক সশস্ত্র সহিংসতায় ৩ জন নিরীহ নাগরিক গুলিবিদ্ধ হন। ওই ঘটনার পর প্রতিমন্ত্রী সরেজমিনে এলাকাটি পরিদর্শন করেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক সমন্বয় সভা করেন। এছাড়া পুলিশের জনবলসংকট দূর করা এবং মাদকের আস্তানাসংলগ্ন স্থানে একটি স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট থানাকে আনুষ্ঠানিক আধাসরকারি পত্র (DO Letter) প্রদান করেন, যা বর্তমানে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরের দাবি, সর্বশেষ পুলিশ প্রশাসন এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দের যৌথ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী—সাধারণ নাগরিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অংশগ্রহণে একটি সমন্বিত ‘সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচি’র অংশ হিসেবেই গত ১৭ অক্টোবর তিনি গেন্ডারিয়ার ওই এলাকায় যান।
ছাদ থেকে গুলিবর্ষণের আশঙ্কা ও আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র প্রদর্শন
অভিযান চলাকালে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে ধরার সুনির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করে বিবৃতিতে বলা হয়, ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং নিজস্ব গোয়েন্দা সূত্রে প্রতিমন্ত্রীর নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টি জানানো হয়েছিল। বিশেষ করে মাদক কারবারিদের পক্ষ থেকে আশপাশের ভবনের ছাদ থেকে আকস্মিক গুলিবর্ষণের আশঙ্কার বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল।
ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি বর্ণনা করে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বিবৃতিতে বলেন:
“কর্মসূচি চলাকালে একটি অস্থায়ী আস্তানার নিকট পৌঁছালে ৩০ থেকে ৩৫ জন আইনলঙ্ঘনকারী ব্যক্তি অতর্কিতে হইচই করে আমাদের গাড়িবহরের দিকে মারমুখী ভঙ্গিতে ধেয়ে আসে। এমতাবস্থায় সুনির্দিষ্ট হামলার আশঙ্কা এবং জানমালের নিরাপত্তায় আমি এবং আমার সরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা গাড়ি থেকে নেমে অত্যন্ত স্বল্প সময়ের জন্য আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র উঁচিয়ে ধরি। সম্ভাব্য অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি নস্যাৎ হওয়ার পরপরই অস্ত্রটি যথাস্থানে রাখা হয়।”
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, তাঁর হাতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্রটি যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বৈধভাবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত এবং কেবল আত্মরক্ষার স্বার্থেই প্রচলিত আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে তা প্রদর্শন করা হয়েছিল।
Read More : প্রতিমন্ত্রী ইশরাককে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
ছবি: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন।
পুলিশের উপস্থিতিতে যৌথ অভিযান: অস্ত্র-মাদক জব্দ ও আটক ৬
পুলিশের সঙ্গে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ নাকচ করে বিবৃতিতে জানানো হয়, ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পরপরই গেন্ডারিয়া থানা-পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করা হয়। পরবর্তীতে পুলিশের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি ও সহায়তায় চিহ্নিত সন্দেহভাজন আস্তানাগুলোতে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
অভিযানের ফলাফল তুলে ধরে জানানো হয়: * আস্তানা উচ্ছেদ: এলাকায় গড়ে ওঠা ৪ থেকে ৫টি অবৈধ ও অস্থায়ী মাদকের আস্তানা সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করা হয়। * জব্দকৃত আলামত: আস্তানাগুলো থেকে হেরোইন ও হেরোইনজাতীয় মাদকদ্রব্য, বিদেশি মদ, মাদক সেবনের সরঞ্জাম, বেশ কিছু দেশীয় ধারালো অস্ত্র, মাদক বিক্রির নগদ অর্থ এবং ছিনতাইকৃত মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। * আটক ও সোপর্দ: অপরাধের সাথে হাতেনাতে জড়িত ৬ জন চিহ্নিত মাদক কারবারিকে আটক করে জব্দকৃত আলামতসহ গেন্ডারিয়া থানা-পুলিশের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে সোপর্দ করা হয়।
৪টি প্রথম সারির গণমাধ্যমের নাম উল্লেখ করে ক্ষোভ প্রকাশ
বিবৃতিতে দেশের কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেছেন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। সুনির্দিষ্টভাবে চারটি গণমাধ্যমের নাম উল্লেখ করে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন:
“দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক কালবেলাসহ মুষ্টিমেয় কয়েকটি গণমাধ্যম অতিউৎসাহী হয়ে খণ্ডিত তথ্য ও ফটোকার্ডের মাধ্যমে অপতথ্য ও বিকৃত সংবাদ পরিবেশন করেছে। বিকৃত, মিথ্যা এবং সম্পূর্ণ বানোয়াট এসব সংবাদ মূলত অভিযানের সাফল্য, পুলিশের ভূমিকা, বিপুল মাদক ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার এবং ৬ জন অপরাধী আটকের ইতিবাচক দিকটি সুপরিকল্পিতভাবে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছে।”
তাঁর অভিযোগ, গণমাধ্যমগুলো কেবল ‘অস্ত্র হাতে প্রতিমন্ত্রীর অভিযান’—এই খণ্ডিত দৃশ্যটিকে চটকদার শিরোনামে প্রচার করে সরকার ও জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে, যা স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পরিপন্থী। যেকোনো সংবাদের সত্যতা যাচাইপূর্বক পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপটসহ তা প্রকাশের জন্য গণমাধ্যমগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ও অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা
মাদকের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি পুনর্ব্যক্ত করে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন জানান, মাদকের আস্তানা সম্পূর্ণরূপে উপড়ে ফেলা এবং ঢাকা-৬ আসনকে মাদকমুক্ত করা জনগণের কাছে তাঁর অন্যতম প্রধান নির্বাচনী অঙ্গীকার।
বিবৃতির শেষাংশে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, “একটি ঘটনাকে খণ্ডিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রচারের মাধ্যমে গড়ে ওঠা সামাজিক আন্দোলনকে স্তব্ধ করা যাবে না।” জনস্বার্থে এ ধরনের মাদকবিরোধী অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে তিনি ঘোষণা দেন।
#IshraqueHossain #PressRelease #Dhaka6 #GendariaAntiDrugDrive #BangladeshPolitics #GenZFrontierNews