ছবি: দরিদ্রের পেটে ভাত না থাকলেও তাদের তালিকা তৈরিতে সরকারের দুই মন্ত্রণালয় ব্যয় করতে যাচ্ছে হাজারো কোটি টাকা।
দরিদ্র খুঁজতেই ব্যয় ২০১০ কোটি টাকা; সমাজকল্যাণ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের পৃথক ডেটাবেজ নিয়ে চরম বিতর্ক
ইকোনমি ডেস্ক | GenZ Frontier | ১৮ অক্টোবর, ২০২৬
ঢাকা — একদিকে সাধারণ দরিদ্র মানুষের পেটে ভাত জুটছে না, অন্যদিকে তাদের শুধু খুঁজে বের করে একটি তালিকা তৈরি করতেই সরকার ব্যয় করতে যাচ্ছে হাজারো কোটি টাকা। খাতা-কলমে সরকারের কাছে বর্তমানে সুনির্দিষ্ট ও নির্ভুল কোনো দরিদ্রের তালিকা নেই[cite: 1]। অথচ একের পর এক নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে[cite: 1]।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, সরকারের দুই মন্ত্রণালয়—সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং অর্থ বিভাগ—একই কাজের জন্য দুটি আলাদা ডেটাবেজ বা রেজিস্ট্রি তৈরি করতে যাচ্ছে, যার সর্বমোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২,০১০ কোটি টাকারও বেশি[cite: 1]। এই দ্বিমুখী নীতি এবং বিপুল অর্থের অপচয় নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা তীব্র সমালোচনা শুরু করেছেন[cite: 1]। এর আগে একই কাজে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ৬৪২ কোটি টাকা অপচয় করেছিল, যার কোনো সুফল দেশবাসী পায়নি[cite: 1]।
একই কাজের জন্য দুই মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রকল্প ও ব্যয়
দরিদ্র খোঁজার এই প্রক্রিয়ায় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জরিপে খরচ হবে ১ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা[cite: 1]। অন্যদিকে, প্রায় একই কাজের জন্য অর্থ বিভাগের আরেকটি প্রকল্পে ব্যয় হবে ২১৬ কোটি টাকা; যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’[cite: 1]।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প: 'ফ্যামিলি স্মার্ট কার্ড' ও পরামর্শক ব্যয়
বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্প সফল করতে চলমান ‘স্ট্রেনদেনিং সোশ্যাল প্রটেকশন ফর ইমপ্রুভ রেজিলিয়েন্স, ইনক্লুশন অ্যান্ড টার্গেটিং’ প্রকল্প সংশোধন করেছে[cite: 1]। এই প্রকল্পের আওতায় জরিপের মাধ্যমে প্রকৃত দরিদ্রদের খুঁজে বের করে রেজিস্ট্রি তৈরি করা হবে[cite: 1]।
- ব্যয় বৃদ্ধি: প্রকল্পটির মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৯০৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা[cite: 1]। এখন প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে ১ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা বাড়িয়ে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৬৯৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা[cite: 1]। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ১ হাজার ৫১৪ কোটি ১১ লাখ এবং বিশ্বব্যাংকের ঋণ থেকে ১ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা খরচ করা হচ্ছে[cite: 1]।
- মেয়াদ: প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৫-এর জুলাই থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারিত[cite: 1]। এটি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় সমাজসেবা অধিদপ্তর বাস্তবায়ন করবে[cite: 1]।
- লক্ষ্যমাত্রা: এই প্রকল্পের অধীনে ১ কোটি ৩৫ লাখ দুস্থকে খোঁজা হবে এবং তাদের ‘ফ্যামিলি স্মার্ট কার্ড’ প্রদান করা হবে[cite: 1]। সরকারি চারটি নির্বাচিত ভাতার কর্মসূচির সহায়তা এই ১ কোটি ৩৫ লাখ সুবিধাভোগীর (যার ৬০ শতাংশ নারী) কাছে পৌঁছানো হবে[cite: 1]।
অস্বাভাবিক ব্যয়ের খাতসমূহ: প্রকল্পের অধীনে কিছু খাতের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে: * জরিপের তথ্য সংগ্রহকারীদের জন্য ব্যয়: ৮২১ কোটি ৯০ লাখ টাকা[cite: 1]। * ফ্যামিলি স্মার্ট কার্ড তৈরির সরঞ্জাম: ৫৫০ কোটি টাকা[cite: 1]। * ১৮টি পরামর্শক ফার্মের জন্য: ১৮৮ কোটি ৮৪ লাখ টাকা[cite: 1]। * ব্যক্তি পরামর্শকের জন্য: ৪০ কোটি ৪০ লাখ টাকা[cite: 1]। * স্থানীয় প্রশিক্ষণ: ৮০ কোটি টাকা[cite: 1]। * উৎসব ব্যয়: ৫০ কোটি টাকা[cite: 1]। * ভ্রমণ ব্যয়: ১০ কোটি টাকা[cite: 1]। * ডেটা স্টোরেজ ও প্রিন্টিং: ২৪ কোটি টাকা (প্রতিটিতে ১২ কোটি)[cite: 1]।
অর্থ বিভাগের প্রকল্প: 'ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি'
অন্যদিকে, অর্থ মন্ত্রণালয় ‘সোশ্যাল প্রটেকশন ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন’ (এসপিডিটিসি) নামে একটি প্রকল্প হাতে নিচ্ছে[cite: 1]। এর মূল লক্ষ্য হলো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে শৃঙ্খলা ফেরাতে ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ তৈরি করা এবং অভিযোগ ট্র্যাক করার সিস্টেম চালু করা[cite: 1]।
- মোট ব্যয়: এই প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ২১৬ কোটি ৪৩ লাখ ৪৮ হাজার টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে (সরকারি তহবিল ১১৯ কোটি ৭ লাখ ৪৪ হাজার এবং বিশ্বব্যাংকের ঋণ ৯৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা)[cite: 1]।
- পরামর্শক ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন: এই প্রকল্পে পরামর্শক খাতেই খরচ ধরা হয়েছে ৬৮ কোটি টাকা[cite: 1]। এ খাতে এত বেশি ব্যয়ের যৌক্তিকতা এবং কোন ধরনের পরামর্শক নিয়োগ করা হবে (দেশীয় বা বৈদেশিক), তা নিয়ে পরিকল্পনা কমিশন ও বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (এসপিইসি) সভায় প্রশ্ন তোলা হয়েছে[cite: 1]। এছাড়া সেমিনার বা কনফারেন্স খাতে বৈদেশিক ঋণসহ প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে[cite: 1]।
প্রক্রিয়াকরণ শেষে একনেকের অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে ২০৩১ সালের মার্চের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে অর্থ বিভাগ[cite: 1]।
ছবি: বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বর্তমান সরকারের আমলে ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্প বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীতে চরম বিশৃঙ্খলা: ৩১% সুবিধাভোগীই ধনী
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী খাতে চরম বিশৃঙ্খলা চলছে[cite: 1]। আসল দুস্থদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থে ভাগ বসাচ্ছেন বিত্তশালীরা[cite: 1]। বিশ্বব্যাংক বলছে, এসব সুবিধার ৩১ শতাংশই পাচ্ছেন ধনীরা[cite: 1]। কিন্তু এই ফাঁকফোকর বন্ধের উদ্যোগগুলো আলোর মুখ দেখেনি[cite: 1]।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদন প্রকাশ করতে গিয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন নতুন রেজিস্ট্রি তৈরির উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও, দুই মন্ত্রণালয়ের আলাদা উদ্যোগ নিয়ে সতর্ক করেছেন[cite: 1]।
তিনি বলেন, ‘একই ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি দুই মন্ত্রণালয় করলে সৃষ্টি হতে পারে বিতর্ক[cite: 1]। কারণ কোনটা সঠিক বলে গণ্য হবে? অর্থনীতিবিদরা বলবেন এটা ঠিক, এনজিওরা বলবেন ওটা ঠিক[cite: 1]। এ ছাড়া নীতিনির্ধারণেও সমস্যা হতে পারে[cite: 1]।’
ড. জাহিদ আরও যোগ করেন, ‘এ ধরনের ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি তৈরির উদ্যোগ টেকসই করতে হলে বিবিএসের মাধ্যমেই করা উচিত ছিল[cite: 1]। কেননা রেজিস্ট্রি তো স্থায়ী বিষয় নয়, এটি সময় সময় আপডেট হবে[cite: 1]। এ রকম চলতে থাকলে বিতর্ক এড়াতে দুই মন্ত্রণালয়ের তালিকা সমন্বয় করতে ভবিষ্যতে বিবিএস হয়তো বলবে আরেকটা প্রকল্প নেওয়া হোক[cite: 1]।’ তিনি এই পরিস্থিতিকে ‘অযথা ইচ্ছা করেই এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে’ বলে মন্তব্য করেন[cite: 1]।
বিবিএস-এর ৬৪২ কোটি টাকা অপচয়ের ইতিহাস
দরিদ্র খোঁজার নামে জনগণের অর্থের শ্রাদ্ধ এটাই প্রথম নয়। এর আগে দরিদ্রের তথ্য সংগ্রহে ৬৪২ কোটি টাকা গচ্চা গিয়েছিল[cite: 1]।
২০১৩ সালে ন্যাশনাল হাউজহোল্ড ডেটাবেজ (এনএইচডি) প্রকল্প হাতে নিয়েছিল বিবিএস; কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি সম্পন্ন হয়নি[cite: 1]। প্রকল্পটিতে বাড়িয়ে ব্যয় করা হয়েছিল ৭২৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা[cite: 1]। মাঠপর্যায়ে তথ্য হালনাগাদের পর ডেটাবেজের ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত এমআইএস তৈরি করতে জেরক্স ইন্ডিয়া কোম্পানি নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেয় বিবিএস[cite: 1]।
প্রতিষ্ঠানটি মাত্র ১৪ জেলার তথ্য আংশিক সংশোধন এবং ৫০টি জেলার ডেটা অসমাপ্ত রেখেই ১১২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা তুলে নিয়ে দেশ থেকে চম্পট যায়[cite: 1]। ফলে শত শত কোটি টাকা খরচের পরও দরিদ্র মানুষের কোনো সঠিক তালিকা তৈরি হয়নি[cite: 1]।
দরিদ্র খোঁজার নতুন এই প্রকল্প নিয়ে বর্তমান পরিসংখ্যান ও তথ্যব্যবস্থা বিভাগের সচিব মো. ফিরোজ সরকারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সক্ষমতা আছে[cite: 1]। কিন্তু সরকার সিদ্ধান্ত নিয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব দিয়েছে[cite: 1]। সেক্ষেত্রে তারা আইন অনুযায়ী আমাদের কাছে অনুমতি নিয়ে জরিপ পরিচালনা করছে[cite: 1]।’
আগের জরিপগুলোতে বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘আমি নতুন এসেছি[cite: 1]। তাই আগের জরিপ সম্পর্কে তেমন কিছু বলতে পারছি না[cite: 1]।’
জনগণের করের টাকায় একই কাজের জন্য দুটি পৃথক বিশাল ব্যয়ের প্রকল্প গ্রহণ এবং অতীতের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা না নেওয়ার বিষয়টি দেশের সচেতন মহল এবং অর্থনীতিবিদদের মাঝে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
#PovertyDatabaseBD #BBSScandal #MinistryOfFinance #SocialWelfareBD #GenZFrontierEconomy