ছবি: কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভবনে ডিজিটাল আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে জরুরি পর্যবেক্ষণ ও সতর্কতা জারি।
অবৈধ ২২ পেমেন্ট এগ্রিগেটর, ৩১টি লোন অ্যাপ ও 'crossmarket.ai' নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বিত সতর্কবার্তা
বিজনেস ডেস্ক | GenZ Frontier | ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
ঢাকা — দেশের দ্রুত বিকাশমান ফিনটেক খাত ও ডিজিটাল লেনদেনের আড়ালে গড়ে ওঠা অনিবন্ধিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযানে নেমেছে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। লাইসেন্সবিহীন পেমেন্ট গেটওয়ে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নাম ভাঙিয়ে চলা ভুয়া বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম এবং গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিয়ে ব্ল্যাকমেইলকারী মাইক্রো-লোন অ্যাপগুলোর কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধে জনসাধারণের উদ্দেশ্যে কড়া সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) জারি করা পৃথক নির্দেশনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এসব অনুমোদনহীন প্ল্যাটফর্মে লেনদেন বা বিনিয়োগ করা দেশের প্রচলিত আইনে সরাসরি দণ্ডনীয় অপরাধ। একইসাথে গ্রাহকদের কষ্টার্জিত অর্থ ও সাইবার নিরাপত্তা রক্ষায় এসব মাধ্যম থেকে সম্পূর্ণরূপে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
১. অনুমোদনহীন ২২ পেমেন্ট এগ্রিগেটর: আইনের ৪(২) ও ৩৭(১) ধারায় সরাসরি অপরাধ
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস সুপারভিশন ডিপার্টমেন্ট (পিএসএসডি) তাদের নিয়মিত অনলাইন মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এমন ২২টি দেশীয় প্ল্যাটফর্ম চিহ্নিত করেছে, যারা কোনো আইনি অনুমোদন ছাড়াই পেমেন্ট এগ্রিগেশন সেবা দিচ্ছিল। এর ফলে এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারী সাধারণ মার্চেন্ট, ই-কমার্স উদ্যোক্তা এবং ক্রেতারা চরম আর্থিক ঝুঁকিতে পড়ছেন।
বিজ্ঞপ্তিতে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়, 'পরিশোধ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আইন, ২০২৪'-এর ৪(২) ধারা অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈধ লাইসেন্স ব্যতীত বাংলাদেশে যেকোনো ধরনের পরিশোধ ব্যবস্থা পরিচালনা বা সেবা প্রদান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যদি কোনো প্ল্যাটফর্ম বা ব্যক্তি এই নিয়ম অমান্য করে সেবা পরিচালনা বা লেনদেনে যুক্ত হয়, তবে তা উক্ত আইনের ৩৭(১) ধারা অনুযায়ী অমার্জনীয় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
ছবি: মতিঝিলে অবস্থিত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক চিহ্নিত ২২টি নিষিদ্ধ পেমেন্ট এগ্রিগেটর:
| ক্রমিক | নিষিদ্ধ প্ল্যাটফর্মের নাম | ক্রমিক | নিষিদ্ধ প্ল্যাটফর্মের নাম |
|---|---|---|---|
| ০১ | BohudurPay | ১২ | UddoktaPay |
| ০২ | ZiniPay | ১৩ | Walletmix |
| ০৩ | PayTiller | ১৪ | BttPay |
| ০৪ | BengaliPay | ১৫ | Easy Pay Automation |
| ০৫ | Payora BD | ১৬ | UniquePay BD |
| ০৬ | SohojPay BD | ১৭ | BD AUTO PAY |
| ০৭ | EasyPayWay | ১৮ | RH Pay BD |
| ০৮ | AK Pay | ১৯ | EzePay |
| ০৯ | BD PAY | ২০ | AutoPay Ltd |
| ১০ | ShajgarPay | ২১ | Biswasto |
| ১১ | AsthaPay / CPay | ২২ | PipraPay |
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্ল্যাটফর্মের কোনো বৈধ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট প্রটেকশন বা ট্রানজ্যাকশন এসক্রো নেই। ফলে যেকোনো সময় গ্রাহকের ফান্ড আটকে পড়া কিংবা সাইবার জালিয়াতির মাধ্যমে লোপাট হওয়ার বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে।
২. ‘crossmarket.ai’: এআই-এর মোড়কে অবৈধ বিনিয়োগ ফাঁদ
পেমেন্ট গেটওয়ের পাশাপাশি অনলাইনভিত্তিক উচ্চ মুনাফার ফাঁদ পাতা প্ল্যাটফর্ম ‘crossmarket.ai’ নিয়ে পৃথক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এআই ট্রেডিং বা স্মার্ট ইনভেস্টমেন্টের নামে সাধারণ নাগরিকদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করছিল এই চক্রটি।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্ল্যাটফর্মটি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিবন্ধিত নয়। ‘পরিশোধ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আইন, ২০২৪’ অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে জনসাধারণের অর্থ জমা রাখা, হস্তান্তর বা বিনিয়োগ গ্রহণ সম্পূর্ণ বেআইনি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্ক করেছে যে, অনুমোদনহীন এসব স্কিমে জেনে বা না জেনে অর্থ লেনদেন করলে ব্যবহারকারীরাও আর্থিক অপরাধের পরোক্ষ সহযোগী হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন।
৩. ডিজিটাল লোন সিন্ডিকেট: ডেটা চুরি ও ব্ল্যাকমেইলে জড়িত ৩১টি অ্যাপ
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক চিত্র উঠে এসেছে বিএফআইইউ-এর তদন্তে। 'সহজ শর্তে فوری ঋণ' দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ফেসবুক, টিকটক ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে কার্যক্রম চালানো ৩১টি অননুমোদিত অ্যাপ চিহ্নিত করা হয়েছে।
ছবি: বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের নজরদারিতে চিহ্নিত হয়েছে সংঘবদ্ধ ঋণ সিন্ডিকেট।
যেভাবে কাজ করে এই প্রতারণা চক্র:
- ডেটা স্ক্র্যাপিং ও অ্যাক্সেস: গ্রাহক অ্যাপটি ইনস্টল করামাত্র তার ডিভাইসের কন্টাক্ট লিস্ট, গ্যালারির ব্যক্তিগত ছবি, কল লগ এবং সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের অ্যাক্সেস হাতিয়ে নেয় সিন্ডিকেটটি।
- অযাচিত ব্ল্যাকমেইল ও চড়া সুদ: স্বল্প পরিমাণ অর্থ দিয়ে কয়েকদিনের মাথায় অস্বাভাবিক সুদ দাবি করা হয়। টাকা দিতে বিলম্ব হলে সংবেদনশীল ছবি ফটোশপ করে গ্রাহকের পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত মহলে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
- মানিলন্ডারিং সংযোগ: বিএফআইইউ নিশ্চিত করেছে যে, এসব ক্ষুদ্র ঋণের নামে আদায়কৃত অর্থ অবৈধ চ্যানেলে পাচার হচ্ছে, যা 'মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২' অনুযায়ী সরাসরি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
বিএফআইইউ কর্তৃক শনাক্তকৃত ৩১টি ক্ষতিকর লোন অ্যাপ:
- সাথী লোন (Sathi Loan)
- পপক্যাশ (PopCash)
- ফিনক্যাশ (FinCash)
- কুইক লোন (Quick Loan)
- কুইক টাকা (Quick Taka)
- ঢাকা ফিন (Dhaka Fin)
- লোনভাইব (LoanVibe)
- দোস্ত লোন (Dost Loan)
- টাকা ক্যাশ লোন (Taka Cash Loan)
- কেওয়নজা লোন (Kewonza Loan)
- এসএসএইচ মানি (SSH Money)
- লোনবাডি (LoanBuddy)
- ক্যাশহোরো (CashHero)
- আলো ক্যাশ (Alo Cash)
- ফাস্ট লোন (Fast Loan)
- ইজি টাকা (Easy Taka)
- ধৈর্য লোন (Dhoirjo Loan)
- ফিন ডট ডু (Fin Dot Do)
- বঙ্গক্যাশ (BongoCash)
- আশা লোন (Asha Loan)
- সুবিধা লোন (Subidha Loan)
- স্মার্ট লোন বিডি (Smart Loan BD)
- অনলাইন লোন বিডি (Online Loan BD)
- সিটি অনলাইন লোন (City Online Loan)
- বিডি সহজ লোন (BD Sohoj Loan)
- ক্যাশ লোন (Cash Loan)
- সোনালী (Sonali)
- লোনহাট (LoanHat)
- টাকানাও (TakaNow)
- সাথি লোন (বিকল্প সংস্করণ)
- সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নামবিহীন অনলাইন লোন সার্ভিস।
৪. আর্থিক ও সাইবার নিরাপত্তা রক্ষায় ৪ দফা জরুরি নির্দেশনা
সাধারণ গ্রাহক এবং অনলাইন ব্যবসায়ীদের আর্থিক জালিয়াতি থেকে মুক্ত রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক নিচের ৪টি স্পষ্ট নির্দেশনা মেনে চলার তাগিদ দিয়েছে:
- অননুমোদিত ঋণ গ্রহণ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা: গুগল প্লে-স্টোর, সোশ্যাল মিডিয়া লিঙ্ক বা কোনো অজানা ওয়েবসাইট থেকে নামহীন লোন অ্যাপ ব্যবহার করে ঋণ নেওয়া যাবে না।
- মানিলন্ডারিং নেটওয়ার্ক পরিহার: যেসব প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব কোনো লাইসেন্স বা ব্যাংকিং অনুমোদন নেই, সেগুলোর কোনো ট্রানজ্যাকশনে অংশ নিয়ে নিজেকে আইনি ঝুঁকিতে ফেলবেন না।
- ব্যক্তিগত ডেটার সুরক্ষা: ঋণের লোভে পড়ে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), পাসপোর্ট নম্বর, ব্যাংক ও কার্ডের পিন বা মোবাইল ফোনের পারমিশন কোনো অপরিচিত ডিজিটাল অ্যাপের সাথে শেয়ার করবেন না।
- অগ্রিম ফি দেওয়া বর্জন: ঋণ ছাড়ের পূর্বে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি 'প্রসেসিং ফি', 'ভেরিফিকেশন চার্জ' কিংবা 'রেজিস্ট্রেশন ফি' বাবদ অগ্রিম টাকা দাবি করে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে সেই প্ল্যাটফর্ম বর্জন করুন।
অভিযোগ দায়েরের মাধ্যম:
ইতোমধ্যে কোনো অননুমোদিত প্ল্যাটফর্মের শিকার হলে কিংবা এমন কোনো চক্রের খোঁজ জানা থাকলে, গোপনীয়তা বজায় রেখে দ্রুত প্রতিকার পাওয়ার পথ খোলা রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক: * অনলাইন পোর্টাল: বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (BFIU) অফিশিয়াল ওয়েবসাইটের অভিযোগ কর্নার। * সরাসরি ও ডাকযোগ: বিএফআইইউ পরিচালকের দপ্তর, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রধান কার্যালয়, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০।
#BangladeshBank #BFIU #FinancialCyberCrime #FintechRegulations #OnlineFraudAlert #BusinessNewsBD #GenZFrontierNews