
ফেনীতে পলাতক ছাত্রলীগ নেতাকে ধরতে গিয়ে বিপত্তি: ডাকাত সন্দেহে গ্রামবাসীর হাতে আটক ৩ যুবদল কর্মী
নিজস্ব প্রতিবেদক, ফেনী | ০৩ জুন ২০২৬
ফেনীর দাগনভূঞায় এক চাঞ্চল্যকর ঘটনার জন্ম হয়েছে। ৫ আগস্টের পর থেকে আত্মগোপনে থাকা নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের এক পলাতক নেতাকে ধরতে গিয়ে উল্টো নিজেরাই বিপদে পড়েছেন তিন যুবদল কর্মী। গভীর রাতে অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা ও ককটেল বিস্ফোরণের শব্দে গ্রামবাসী তাদের ‘ডাকাত’ ভেবে ঘিরে ফেলে এবং বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখে। পরবর্তীতে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
গতকাল মঙ্গলবার (২ জুন) রাতে ঘটা এই নাটকীয় ঘটনার পর আজ বুধবার (৩ জুন) দুপুরে উভয় পক্ষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির অবসান হলে মুচলেকা নিয়ে আটক তিনজনকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। আটককৃত ওই তিন যুবদল কর্মী হলেন— মোহাম্মদ একরাম, গোলাম মাওলা ও হৃদয়।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান ও ককটেল বিস্ফোরণ
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জানা যায়, গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই ফেনীর দাগনভূঞা এলাকার ওই নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা কামরুল হাসান পলাতক ছিলেন। মঙ্গলবার রাতে স্থানীয় যুবদলের কয়েকজন কর্মীর কাছে খবর আসে যে, কামরুল হাসান গোপনে একটি বাড়িতে অবস্থান করছেন।
এই তথ্যের ভিত্তিতে রাত গভীর হলে দুটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল ওই বাড়িটি ঘেরাও করতে যায়। বাড়িটি ঘেরাও করার একপর্যায়ে আকস্মিকভাবে সেখানে বেশ কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণের বিকট শব্দ শোনা যায়, যা পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।
ডাকাত আতঙ্কে গ্রামবাসীর প্রতিরোধ
মাঝরাতে ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ এবং অপরিচিত লোকজনের সন্দেহজনক গতিবিধি দেখে গ্রামবাসীর মধ্যে ‘ডাকাত পড়েছে’ বলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যেই এলাকার সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়ে বাড়িটি চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। অবস্থা বেগতিক দেখে অটোরিকশায় আসা দলটির অনেকেই পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও মোহাম্মদ একরাম, গোলাম মাওলা ও হৃদয় নামের তিন যুবক গ্রামবাসীর হাতে ধরা পড়ে যান। উত্তেজিত জনতা এরপর তাদের তিনজনকে ধরে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে রাখে।
রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা ও পুলিশের হস্তক্ষেপ
খুঁটির সাথে বেঁধে রাখার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন জসিম উদ্দিন বাবু ও তার ছেলে জাহিদ হাসান, যারা নিজেদের যুবদল নেতা হিসেবে পরিচয় দেন। তারা দাবি করেন যে, আটককৃতরা ডাকাত নয় বরং তারা সরকারি দলের লোক এবং পলাতক আসামিকে ধরতেই এখানে এসেছেন। এই পরিচয় দিয়ে তারা আটক তিন যুবককে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
তবে গ্রামবাসী তাদের কথায় আশ্বস্ত না হয়ে পুলিশে খবর দেয়। সংবাদ পেয়ে দাগনভূঞা থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালে উত্তেজিত জনতা ওই তিন যুবককে পুলিশের হাতে সোপর্দ করে। এ ঘটনার পর রাতেই ভুক্তভোগী বাড়ির মালিক ও পলাতক ছাত্রলীগ নেতা কামরুল হাসানের বাবা হামিদুল হক থানায় গিয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
ভুল বোঝাবুঝির অবসান ও মুচলেকা দিয়ে মুক্তি
ডাকাত সন্দেহে আটকের বিষয়টি নিয়ে এলাকায় বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলেও বুধবার দুপুরে পুলিশি তদন্তে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসে।
এ বিষয়ে দাগনভূঞা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ ফয়জুল আজীম নোমান সাংবাদিকদের জানান, ‘প্রাথমিকভাবে গ্রামবাসী ডাকাত সন্দেহে তাদের আটক করলেও তদন্তে দেখা গেছে এটি কোনো ডাকাতির ঘটনা নয়। মূলত নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের পলাতক এক নেতা ওই বাড়িতে অবস্থান করছেন— এমন খবরে তাকে ধরতেই ওই তিন যুবক সেখানে গিয়েছিলেন। বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ার পর থানায় উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে আলোচনা হয়। পরে তাদের সম্মতিতে একটি মুচলেকা নিয়ে আটক তিন যুবককে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’
এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে না জানিয়ে কোনো অভিযান চালাতে গেলে তা কতটা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।