
মুক্তিযুদ্ধে একমাত্র 'বীর বিক্রম' খেতাবপ্রাপ্ত আদিবাসী বীর ইউকে চিং মারমা
লিগ্যাসি আর্কাইভ ডেস্ক | GenZ Frontier | ২৪ জুন ২০২৬
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের সংগ্রাম ছিল না; এটি ছিল বাংলার আপামর জনতা, হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং দেশের সকল আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়া এক অস্তিত্ব রক্ষার মহাকাব্য। এই মহাকাব্যে পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের আত্মত্যাগ এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। আর এই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বীর সেনানীদের মধ্যে এক অসামান্য ও অনন্য নাম—বীর বিক্রম ইউকে চিং (উক্যচিং)।
বান্দরবানের মারমা জাতিগোষ্ঠীর এই সূর্যসন্তান আদিবাসীদের মধ্যে একমাত্র ব্যক্তি, যিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসিকতার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে 'বীর বিক্রম' খেতাবে ভূষিত হয়েছেন।
ইপিআর থেকে সরাসরি রণাঙ্গনে
মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন দেশমাতৃকাকে রক্ষার প্রবল তাগিদে বাঙালি ভাইদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন ইউকে চিং। ১৯৭১ সালের উত্তাল দিনগুলোতে তিনি রংপুর ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) উইংয়ের অধীন লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা বিওপিতে (বর্ডার আউটপোস্ট) কর্মরত ছিলেন।
২৫ মার্চের কালো রাতের পর দেশের অন্যান্য দেশপ্রেমিক সৈনিকদের মতো তিনিও প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেন। প্রাথমিক প্রতিরোধের পর তিনি পাটগ্রাম এলাকায় অবস্থান গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে যুদ্ধ কৌশলগত কারণে ৬ নম্বর সেক্টরের অধীন সাহেবগঞ্জ সাব-সেক্টরে যুক্ত হন। এই সেক্টরে তিনি তার অসীম বীরত্ব এবং রণকৌশলের মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বুকে কাঁপন ধরিয়েছিলেন।
চৌধুরীহাটের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও সহযোদ্ধা হারানোর বেদনা
যুদ্ধের ময়দান কখনো কেবল বীরত্বের নয়, এটি গভীর বেদনারও। ইউকে চিং-এর জীবনে এমন এক বিভীষিকাময় এবং দুঃসাহসিক অধ্যায় ছিল কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী সংলগ্ন চৌধুরীহাটের যুদ্ধ।
এই তুমুল সম্মুখ সমরে মুক্তিবাহিনীর সাথে পাকিস্তানি বাহিনীর ভয়াবহ লড়াই হয়। লড়াইয়ের এক পর্যায়ে ইউকে চিং-এর চোখের সামনেই শহীদ হন মুক্তিবাহিনীর অকুতোভয় লেফটেন্যান্ট সামাদ (আবু মঈন আশফাকুস সামাদ, বীর উত্তম) সহ আরও কয়েকজন প্রিয় সহযোদ্ধা। শত্রুর ভারি গোলার আঘাতে সেদিন তিনিও শহীদ বা মারাত্মকভাবে আহত হতে পারতেন, কিন্তু ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। সহযোদ্ধাদের হারানোর শোক তাকে দমিয়ে দিতে পারেনি, বরং শত্রুর প্রতি তার আক্রমণকে আরও শাণিত ও অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছিল।
"আমি সৈনিক, যুদ্ধের মাঠেই থাকব"—জেনারেল অরোরাকে অবাক করা জবাব
রণাঙ্গনে ইউকে চিং কেবল একজন সাধারণ যোদ্ধাই ছিলেন না, তার প্রতিরক্ষা কায়দা এবং রণকৌশল ছিল অত্যন্ত নিখুঁত ও বিস্ময়কর। তার বীরত্বের একটি অভাবনীয় ঘটনা ঘটেছিল রণাঙ্গন পরিদর্শনের সময়।
একবার ভারত-বাংলাদেশ মিত্রবাহিনীর যৌথ কমান্ডের অধিনায়ক জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা মাঠ পরিদর্শনে আসেন। তিনি যখন ইউকে চিং-এর দুর্ধর্ষ প্রতিরক্ষা কায়দা ও সাহসিকতার কথা জানতে পারেন, তখন আবেগে আপ্লুত হয়ে এই আদিবাসী বীরকে খুশিতে বুকে জড়িয়ে ধরেন। জেনারেল অরোরা তাকে প্রস্তাব দেন নিজের সঙ্গে চলে যাওয়ার জন্য, যেখানে হয়তো আরও নিরাপদ এবং উচ্চতর কোনো দায়িত্ব তার জন্য অপেক্ষা করছিল।
কিন্তু দেশপ্রেমে উন্মত্ত এই বীর সেনানী জেনারেল অরোরার প্রস্তাব সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করে যে জবাব দিয়েছিলেন, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তিনি বলেছিলেন:
"না স্যার, আমি সৈনিক। আমি যুদ্ধের মাঠেই থাকব।"
তার এই একটি বাক্যই বুঝিয়ে দেয় দেশ স্বাধীনের প্রতি তার কতটা ইস্পাতকঠিন সংকল্প ছিল। তিনি তার কথা রেখেছিলেন এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হওয়ার আগ পর্যন্ত শেষ দিনটি পর্যন্ত তিনি যুদ্ধের মাঠেই লড়াই করে গেছেন।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও বীর বিক্রম খেতাব
মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে এই আদিবাসী বীরের অসামান্য অবদান, সম্মুখ সমরে সাহসিকতা এবং অবিচল দেশপ্রেমের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার তাকে 'বীর বিক্রম' খেতাবে ভূষিত করে।
১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রকাশিত সরকারি নথিতে তার এই সম্মাননার কথা উল্লেখ করা হয়। ‘দি বাংলাদেশ গেজেট-এক্সট্রা অর্ডিনারি পাবলিশড বাই অথরিটি’ বইয়ের ক্রমিক নম্বর ১০০-তে তার এই খেতাব প্রাপ্তির আনুষ্ঠানিক উল্লেখ রয়েছে। সমগ্র আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে তিনিই একমাত্র এই উচ্চতর রাষ্ট্রীয় খেতাব অর্জনকারী মুক্তিযোদ্ধা, যা পাহাড়ি ও সমতলের সকল মানুষের জন্য এক অপরিসীম গর্বের বিষয়।
নতুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা
আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে জেন-জি (Gen-Z) বা নতুন প্রজন্ম যখন অসাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যহীন এক সমাজের স্বপ্ন দেখে, তখন বীর বিক্রম ইউকে চিং-এর জীবন তাদের জন্য সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। তিনি প্রমাণ করেছেন, দেশপ্রেমের কোনো নির্দিষ্ট ভাষা, ধর্ম বা জাতিগোষ্ঠী নেই। মাতৃভূমির জন্য নিবেদিত প্রাণই একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তান, পাহাড়ের অহংকার এবং রণাঙ্গনের অকুতোভয় এই বীর সেনানীর প্রতি আমাদের বিনম্র ও নতজানু শ্রদ্ধা।
Frequently Asked Questions (FAQ)
১. ইউকে চিং (উক্যচিং) কে ছিলেন? ইউকে চিং ছিলেন বান্দরবানের মারমা জাতিগোষ্ঠীর এক অকুতোভয় সন্তান এবং বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র আদিবাসী 'বীর বিক্রম' খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা।
২. ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় তিনি কোথায় কর্মরত ছিলেন? মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় তিনি রংপুর ইপিআর (EPR) উইংয়ের অধীন লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা বিওপি-তে (BOP) কর্মরত ছিলেন।
৩. মুক্তিযুদ্ধে তিনি কোন সেক্টরের অধীনে যুদ্ধ করেন? তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের ৬ নম্বর সেক্টরের অধীন সাহেবগঞ্জ সাব-সেক্টরে একজন বীরত্বপূর্ণ যোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধ করেছিলেন।
৪. চৌধুরীহাটের যুদ্ধে কোন বিখ্যাত সহযোদ্ধা শহীদ হয়েছিলেন? কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী সংলগ্ন চৌধুরীহাটের সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ইউকে চিং-এর সহযোদ্ধা লেফটেন্যান্ট আবু মঈন আশফাকুস সামাদ (বীর উত্তম) শহীদ হন।
৫. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরাকে তিনি কী জবাব দিয়েছিলেন? জেনারেল অরোরা তার বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে তাকে নিজের সাথে নিয়ে যেতে চাইলে ইউকে চিং দৃঢ়তার সাথে জবাব দেন, "না স্যার, আমি সৈনিক। আমি যুদ্ধের মাঠেই থাকব।"
#UKChing #BirBikrom #MarmaCommunity #BangladeshLiberationWar #Sector6 #LegacyArchive #GenZFrontierHistory