
‘পাপা টাইগার’ জেনারেল ওসমানী: মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ও রণাঙ্গনের এক অকুতোভয় বীর
হিস্ট্রি ডেক্স | GenZ Frontier | ২০ জুন ২০২৬
পাকিস্তানিদের কাছে তিনি ছিলেন 'পাপা টাইগার', যাঁর নাম শুনলেই ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতো তৎকালীন পাকিস্তানের তাগড়া তাগড়া সেনা সদস্যরা। তিনি আর কেউ নন, তিনি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ও রণাঙ্গনের অকুতোভয় বীর সৈনিক জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানী।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মহারথির নামটা আমাদের দেশের তথাকথিত 'চেতনাবাজ' সম্প্রদায়ের মুখে তেমন একটা ওঠে না। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের প্রধান সেনাপতি হিসেবে নিজের জীবন বাজি রেখে যিনি এই জাতিকে স্বাধীনতা উপহার দিয়ে গেছেন, সেই আতাউল গনি ওসমানীকে আমরা তাঁর প্রাপ্য সম্মানটা হয়তো কখনোই সেভাবে দিতে পারিনি।
অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা এক আপসহীন নেতা
জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী ছিলেন এমন একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি অন্যায় ও অনিয়মের সামনে কখনোই মাথা নত করেননি। একাত্তরে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মোতাবেক দেশমাতার মুক্তির জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেও, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বাকশাল গঠন ও আরও বিভিন্ন কারণে তিনি বঙ্গবন্ধুর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এ কারণে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মহলের কাছে তিনি হয়তো 'ভিলেন' হিসেবেই রয়ে গেছেন। কিন্তু দেশের কল্যাণের স্বার্থে শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধু নন, বরং যে কারো বিরুদ্ধেই তিনি রুখে দাঁড়াতে প্রস্তুত থাকতেন।
জন্ম, শৈশব ও অসামান্য মেধার স্বীকৃতি
বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের ক্ষণজন্মা এই বীর সেনানীর জন্ম হয়েছিল ১৯১৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জে। তবে তাঁর পৈত্রিক নিবাস ছিল সিলেট জেলার তৎকালীন দয়ামীর উপজেলায় (বর্তমানে ওসমানীনগর উপজেলা)। এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। বাবা খান বাহাদুর মফিজুর রহমান একজন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় ওসমানীর শৈশব কেটেছে বিভিন্ন স্থানে।
তুখোড় মেধাবী আতাউল গনি ওসমানীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয় গৌহাটির একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ১৯৩৪ সালে অনুষ্ঠিত ম্যাট্রিক পরীক্ষায় তিনি গোটা ভারতবর্ষে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। এমন অসাধারণ কৃতিত্বের পুরস্কার হিসেবে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘প্রিটোরিয়া’ পুরস্কারে ভূষিত করেছিল।
ব্রিটিশ ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার
- ব্রিটিশ আর্মি: ১৯৩৮ সালে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাসের পর ১৯৩৯ সালে তিনি রয়েল আর্মড ফোর্সে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন। ব্রিটিশ ভারতীয় একাডেমিতে এক বছর প্রশিক্ষণ শেষে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কমিশনড অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। মাত্র ২৪ বছর বয়সে, ১৯৪২ সালে তাঁকে মেজর পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তৎকালীন সময়ে তিনিই ছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সর্বকনিষ্ঠ পদোন্নতি পাওয়া মেজর।
- পাকিস্তান আর্মি: ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর তিনি ব্রিটিশ আর্মি ছেড়ে পাকিস্তান আর্মিতে যোগ দেন। শুরুতে তাঁর পদবি ছিল লেফটেন্যন্ট কর্নেল। ১৯৪৯ সালে তিনি চিফ অফ জেনারেল স্টাফের ডেপুটি হন। ১৯৫১ সালে তাঁকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রথম ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। তাঁর হাত ধরেই চট্টগ্রাম সেনানিবাস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
পরবর্তীতে পাঞ্জাব রেজিমেন্টের নবম ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক, ইপিআর-এর অতিরিক্ত কমান্ড্যান্ট ও সেনাবাহিনীর জেনারেল স্টাফ অফিসারের দায়িত্ব পালনের পর ১৯৬৬ সালের মে মাসে তিনি কর্নেল পদবিতে অবসর গ্রহণ করেন।
রাজনীতিতে প্রবেশ ও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়কত্ব
সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর ওসমানী রাজনীতির মাঠে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৭০ সালে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জ-বিশ্বনাথ এলাকা থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হন।
এরপর নানা ঘটনাপ্রবাহ পেরিয়ে শুরু হয়ে যায় একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধের শুরুর দিকে তিনি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে গমন করেন। ১৯৭১ সালের ১১ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের একটি ভাষণে এম. এ. জি. ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নতুন অবকাঠামো উল্লেখ করেন। পরের দিনই তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি ও মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
যুগান্তকারী রণকৌশল
নিজের রণকৌশলের অংশ হিসেবে প্রথমেই তিনি সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি আলাদা আলাদা সেক্টরে ভাগ করে ফেলেন। বিচক্ষণ এই সেনাপ্রধানের প্রাথমিক রণকৌশল ছিল শত্রুকে ছাউনির মধ্যে আটকে রাখা ও তাদের যোগাযোগের সবগুলো মাধ্যম বিচ্ছিন্ন রাখা। মে মাস পর্যন্ত এভাবে যুদ্ধ পরিচালনার পর তিনি বুঝতে পারেন যে, কেবল এই কৌশলে যুদ্ধ জয় সম্ভব নয়।
অতঃপর তিনি তাঁর রণকৌশল পরিবর্তন করেন। প্রাক্তন ইপিআর-এর বাঙালি সদস্য, আনসার, মুজাহিদ, পুলিশ বাহিনী ও যুবকদের নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন দুর্ধর্ষ 'গণবাহিনী'। এরপর কিছুসংখ্যক গেরিলা যুবকদের নিয়ে নৌ কমান্ডো এবং যুদ্ধের শেষের দিকে এসে বিমান বাহিনীও গড়ে তুলেছিলেন তিনি।
১৬ই ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণ ও কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুক্তিবাহিনীর প্রধান হিসেবে জেনারেল আতাউল গনি ওসমানীর উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও, তিনি সেখানে উপস্থিত হতে পারেননি।
মূলত যে হেলিকপ্টারে করে ওসমানী ঢাকায় যাচ্ছিলেন, সেই হেলিকপ্টারে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা গুলি করায় সেটি সময়মতো ঢাকায় পৌঁছাতে পারেনি। অনেকের মতে, ভারতই ওসমানীর হেলিকপ্টারের ওপর এই হামলা চালিয়েছিল—যাতে পাকিস্তানি বাহিনী জেনারেল ওসমানীর কাছে আত্মসমর্পণ না করে ভারতের লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করে। দিনশেষে ১৬ই ডিসেম্বর ভারতের সেই আশাই পূরণ হয়েছিল।
যুদ্ধ-পরবর্তী জীবন, পদত্যাগ ও শেষ বিদায়
যুদ্ধের পর সদ্য জন্ম নেওয়া বাংলাদেশের নবগঠিত সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন জেনারেল ওসমানী। পরবর্তীতে তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জীবন ছিল অত্যন্ত ঘটনাবহুল: * ১৯৭২: ১২ই এপ্রিল সেনাপ্রধানের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়ে নৌ যোগাযোগ, জাহাজ ও বিমান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। * ১৯৭৩: স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। এরপর ডাক, তার ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পান। * ১৯৭৪-৭৫: সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত মেনে নিতে না পেরে ১৯৭৪ সালের মে মাসে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৭৫ সালে দেশে বাকশাল ব্যবস্থা প্রবর্তিত হলে এর প্রতিবাদে সংসদ সদস্য পদ ও আওয়ামী লীগের সদস্য পদ উভয়ই ত্যাগ করেন। * ১৯৭৫-৭৬: ১৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর খন্দকার মোশতাক ক্ষমতা দখল করলে তিনি প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা পদে নিয়োগ পান। কিন্তু ৩রা নভেম্বরের কলঙ্কময় জেল হত্যার পর তিনি সেখান থেকেও পদত্যাগ করেন। * ১৯৭৬-৮১: ১৯৭৬ সালে তিনি ‘জাতীয় জনতা পার্টি’ নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং ১৯৭৮ ও ১৯৮১ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে পরাজিত হন।
এরই মাঝে তাঁর ক্যান্সার ধরা পড়ে। ১৯৮৪ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই মহান বীর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পর তাঁকে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় সিলেটের হযরত শাহজালাল (র.) এর মাজারে সমাহিত করা হয়।
জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানীর মতো আপসহীন জাতীয় বীরেরা মৃত্যুর পরেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন।
#জেনারেল_ওসমানী #মুক্তিযুদ্ধ #সর্বাধিনায়ক #পাপা_টাইগার #বাংলাদেশ_ইতিহাস #GenZFrontier