ছবি সূত্র: Bayezid Storyline
একাত্তরের ‘প্রীতিলতা’ শিরিন বানু মিতিল: পুরুষের বেশে রণাঙ্গন কাঁপানো এক অকুতোভয় নারী
Sayad Md Bayezid Hosan | GenZ Frontier | ২০ জুন ২০২৬
১৯৭১ সালের কথা। এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহ। ভারতের ‘দ্য স্টেটসম্যান’ (The Statesman) পত্রিকার সাংবাদিক এবং পরবর্তীতে সম্পাদক মানস ঘোষ তাঁর পত্রিকায় একজন মুক্তিযোদ্ধার একটি ছবি প্রকাশ করেন। ছবিটি প্রকাশের পরপরই চারদিকে ব্যাপক আলোড়ন ছড়িয়ে পড়ে। কারণ, ভারত ও বাংলাদেশের মানুষ জানতে পারে, ছবিতে অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা আসলে একজন নারী।
পুরুষের বেশে তিনি সহযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন এবং পাবনার বিভিন্ন রণাঙ্গনে সশস্ত্র লড়াই করেছিলেন। এই মহীয়সী নারীই একাত্তরের রণাঙ্গনের “প্রীতিলতা” খ্যাত বীর মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানু মিতিল।
রাজনৈতিক ও সংগ্রামী পারিবারিক শেকড়
শিরিন বানু মিতিলের জন্ম ১৯৫০ সালের ২ সেপ্টেম্বর পাবনা জেলায়। ছোটবেলা থেকেই তিনি এক রাজনীতি-সচেতন ও সংগ্রামী পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। তার মা সেলিনা বানু ছিলেন পাবনা জেলার ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সভাপতি এবং পরবর্তীতে যুক্তফ্রন্ট সরকারের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য। বাবা খন্দকার শাহজাহান মোহাম্মদ পাবনা জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন। এমনকি তার মামারাও ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী।
পারিবারিক এই রাজনৈতিক ও দেশপ্রেমের আবহ শিরিন বানুকে ছোটবেলা থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে শিখিয়েছিল।
সমাজ ও প্রথা ভেঙে রণাঙ্গনে
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় শিরিন বানু ছিলেন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের বাংলা বিভাগের স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী। সমাজের প্রচলিত প্রথা, নারীত্বের চিরায়ত গণ্ডি এবং সব ধরনের বাধা ভেঙে মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি পুরুষের পোশাক পরেন। এরপর অস্ত্র হাতে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে রণাঙ্গনে সক্রিয় থাকেন।
একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা: "আমাদের মেয়েরা যখন লড়ছে, বিজয় আসবেই"
মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর একটি ঘটনা শিরিন বানু মিতিলকে আজীবন নাড়া দিত। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি একবার বলেছিলেন:
"আমি যখন কুষ্টিয়া থেকে চুয়াডাঙ্গার দিকে যাচ্ছিলাম, তখন একদিন গভীর রাতে আমাদের দলটিকে পথের মাঝে আটকানো হয়। মূলত ওই অঞ্চলে পাকিস্তানি সেনাদের প্রতিরোধ করতেই সতর্কতামূলক পাহারায় যারা ছিল, তারা আমাদের পরিচয় জানতে চায়। আমরা পরিচয় দিলেও তারা প্রথমে সেটা বিশ্বাস করতে চাচ্ছিল না। কারণ আমাদের সঙ্গে যিনি আরআই (RI) ছিলেন, তিনি ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের, ফলে তার ভাষার টান ছিল বিহারিদের মতো। তাই আমরা যে সত্যি মুক্তিযোদ্ধা, তার প্রমাণ চাইল তারা।"
পরিস্থিতির শিকার হয়ে তাদের দলের একজন বলতে বাধ্য হন, "আপনারা কি আকাশবাণীতে শিরিন বানুর কথা শুনেছেন?" প্রহরীরা হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলে বলা হয়, সেই শিরিন বানুই তাদের সঙ্গে আছেন।
শিরিন বানু মিতিল সেই রাতের অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, "সেই সময় আমি খুব সন্দিহান ছিলাম যে, এতো বড় দলের ভেতরে ছদ্মবেশে একজন মেয়ে আছে, এটাকে তারা হয়তো অন্যভাবে দেখবে। কিন্তু আমার পরিচয় জানার পরেই দেখা গেল, তারা সবাই আমাকে ঘিরে ধরল। তাদের মধ্যে এক বৃদ্ধ পিতা আমার কাছে এগিয়ে এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন— ‘মা, আমরা আর ভয় করি না। আমাদের মেয়েরা যখন আমাদের সঙ্গে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে, তখন বিজয় আমাদের হবেই।’"
এই ঘটনা তাঁকে গভীরভাবে উপলব্ধি করিয়েছিল যে, স্বাধীনতার জন্য সারাদেশের মানুষ কীভাবে উদ্দীপনা ও উৎসাহ নিয়ে পরস্পরের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে।
স্বাধীন দেশের নির্মম বাস্তবতা ও আমলাতান্ত্রিক বঞ্চনা
সবচেয়ে কষ্টের ও আক্ষেপের বিষয় হলো, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাষ্ট্র বা সমাজ এই অসামান্য নারী মুক্তিযোদ্ধাকে তাঁর প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে পারেনি।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অবহেলার অজুহাতে দীর্ঘদিন বন্ধ রাখা হয়েছিল তাঁর মুক্তিযোদ্ধা ভাতা। এমনকি তিনি জীবিত থাকাকালে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় তাঁর নাম স্থগিত করে রাখা হয়েছিল। যদিও শিরিন বানু মিতিল দেশমাতৃকার টানে যুদ্ধ করেছিলেন, কোনো ভাতা কিংবা জাগতিক সম্মানের আশা তিনি কখনোই করেননি। তবুও, রাষ্ট্রযন্ত্রের এই অবহেলা আমাদের ইতিহাসের এক চরম ব্যর্থতা ও লজ্জার অধ্যায় হিসেবেই রয়ে যাবে।
একাত্তরের এই ‘প্রীতিলতা’ তাঁর অসীম সাহসিকতা ও ত্যাগের মাধ্যমে প্রমাণ করে গেছেন, দেশপ্রেমের কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গ বা পোশাক হয় না।
ট্যাগস: