১৯৭১ সালে টাঙ্গাইলের বাতেন বাহিনীর রণাঙ্গনের ইতিহাস: একটি মহাকাব্যিক ও বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন
বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে টাঙ্গাইল জেলার গুরুত্ব অপরিসীম। যমুনা বিধৌত এই জনপদটি ছিল যুদ্ধের একটি কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দু, যা ঢাকা ও উত্তরবঙ্গের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করত। এই অঞ্চলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, তার অন্যতম কারিগর ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার আব্দুল বাতেন এবং তাঁর হাতে গড়া 'বাতেন বাহিনী' । মূলত ছাত্র আন্দোলনের গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া এই বাহিনীটি পরবর্তীকালে একটি সুশৃঙ্খল গেরিলা বাহিনীতে রূপান্তর লাভ করে এবং দক্ষিণ টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও ঢাকার কিছু অংশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা পাকিস্তানি সেনাদের ঘুম কেড়ে নেয় । অত্র প্রতিবেদনে বাতেন বাহিনীর গঠন প্রক্রিয়া, এর সাংগঠনিক শৈলী, রণাঙ্গনের উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসমূহ এবং ১১ নম্বর সেক্টরের সাথে এর আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে একটি নিবিড় ঐতিহাসিক পর্যালোচনা উপস্থাপন করা হলো।
বাতেন বাহিনীর অভ্যুদয়: পটভূমি ও প্রস্তুতির আখ্যান
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন সমগ্র দেশ স্বাধিকার আন্দোলনে উত্তাল, টাঙ্গাইল ছিল সেই আন্দোলনের অন্যতম উৎসস্থল। ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর ছাত্র সমাজ সশস্ত্র যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে শুরু করে । খন্দকার আব্দুল বাতেন, যিনি তৎকালীন করটিয়া সা’দত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন, তিনি শুরু থেকেই টাঙ্গাইলে 'জয় বাংলা বাহিনী'র প্যারেড ও প্রশিক্ষণের নেতৃত্ব দেন ।
২৬শে মার্চ সকালে যখন ইপিআর বাহিনীর ওয়ারলেস কর্তৃক ট্রান্সমিট করা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার শেষ বার্তাটি টাঙ্গাইলে পৌঁছায়, তখন এস এম রহমানের মাধ্যমে তা খন্দকার আব্দুল বাতেনের হস্তগত হয় । এই বার্তা পাওয়ার পর তিনি আর কালক্ষেপণ করেননি। ৩রা এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী টাঙ্গাইল শহর দখল করে নিলে মুক্তিযোদ্ধারা সাময়িকভাবে পিছু হটেন। খন্দকার আব্দুল বাতেন তাঁর নিজ থানা নাগরপুরের কনোড়া গ্রামে ফিরে আসেন এবং সেখান থেকেই একটি স্থানীয় গেরিলা বাহিনী গঠনের পরিকল্পনা শুরু করেন । ৩০শে মার্চ সখিপুর উপজেলার আছিমতলায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুলিতে সা’দত কলেজের ছাত্র জুমারত আলী নিহত হওয়ার ঘটনাটি এই বাহিনী গঠনে তীব্র অনুঘটক হিসেবে কাজ করে ।
বাতেন বাহিনীর যাত্রা শুরু হয়েছিল অত্যন্ত সীমিত সামর্থ্য নিয়ে। শুরুর দিকে তাঁদের ভাণ্ডারে ছিল মাত্র ২টি সাধারণ বন্দুক এবং ১৬৫ রাউন্ড গুলি । দেলদুয়ারের লাউহাটি ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান আতোয়ার রহমান খান প্রথম ম্যাগাজিনবিহীন ৪টি রাইফেল দিয়ে এই বাহিনীকে সহায়তা করেন । তবে বাতেনের প্রখর নেতৃত্বগুণে এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে অচিরেই এই ক্ষুদ্র দলটিতে ছাত্র, যুবক, কৃষক এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও ইপিআর থেকে পালিয়ে আসা বাঙালি সৈনিকরা যোগ দিতে থাকেন ।
সাংগঠনিক কাঠামো ও নেতৃত্বের বিন্যাস
বাতেন বাহিনী কোনো অসংগঠিত বিদ্রোহী দল ছিল না, বরং এর গঠন ছিল নিয়মিত সামরিক বাহিনীর আদলে সুশৃঙ্খল ও পেশাদার। সমগ্র বাহিনীকে ২১টি কোম্পানিতে বিভক্ত করা হয়েছিল, যার অধীনে ছিল ৬৩টি প্লাটুন এবং ১০০টি সেকশন । বাহিনীর মোট সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৩,০৫০ থেকে ৫,০০০ জন সশস্ত্র যোদ্ধা, যাঁদের সহযোগী হিসেবে কাজ করত আরও ২,০০০ জন স্বেচ্ছাসেবক । বাতেন বাহিনীর এই বিশাল যোদ্ধাদের সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য টাঙ্গাইল ও মানিকগঞ্জে তিনটি প্রধান প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল: মানিকগঞ্জের তিল্লী গ্রাম, দেলদুয়ারের লাউহাটি এবং নাগরপুরের শাহজানির চর ।
বাতেন বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব ও কোম্পানি কমান্ড
| পদবি/বিভাগ | দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান ব্যক্তিত্ব |
|---|---|
| বাহিনী প্রধান | খন্দকার আব্দুল বাতেন |
| ভারপ্রাপ্ত প্রধান (বাতেন ভারতে থাকাকালীন) | এ কে এম আজাদ শাহজাহান |
| নিরাপত্তা ও বেসামরিক প্রধান | মীর শামসুল আলম শাহজাদা |
| ফিল্ড কমান্ডার | সুবেদার মেজর আব্দুল বারী |
| কোয়ার্টার মাস্টার | খন্দকার আব্দুল করিম |
| তথ্য ও গোয়েন্দা বিভাগ | উপেন্দ্রনাথ সরকার বিএসসি |
| ডেপুটি চিফ (নিয়োগ ও জয় বাংলা কোম্পানি) | মো. দেলোয়ার হোসেন হারিচ |
| ডেপুটি চিফ (বঙ্গবন্ধু কোম্পানি) | মো. আব্দুর রশীদ |
এই বাহিনীর কোম্পানি কমান্ডারদের মধ্যে ছিলেন মেজর আবু তাহের, নায়েক হুমায়ুন কবীর খান, নায়েক আব্দুস সামাদ, নায়েক ওয়াজেদ আলী খান, নায়েক আবুল খায়ের, সুবেদার আলমগীর এবং আরও অনেকে । এই সামরিক কর্মকর্তারা মূলত বাতেন বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও যুদ্ধের কৌশলগত মান নিশ্চিত করতেন।
টাঙ্গাইলের রণাঙ্গনে বাতেন বাহিনীর এই যুদ্ধগাথা চিরকাল আমাদের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের একটি অমলিন ও উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবে।
🔎 Related Articles
🔔 Next Historical Update
পরবর্তী প্রকাশনায় আসছে — ১৯৭১ সালে টাঙ্গাইলের বাতেন বাহিনীর রণাঙ্গনের ইতিহাস: একটি মহাকাব্যিক ও বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন
মুক্তিযুদ্ধের অজানা অধ্যায় জানতে আমাদের সাথে থাকুন।
📢 আমাদের ব্লগ ফলো করুন
বাংলাদেশের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন পেতে আমাদের অনুসরণ করুন।
Follow GenZ Frontier© 2026 All Rights Reserved GenZ Frontier
Short Note: This content is published for education purpose regarding the History of Bangladesh 1971.

No comments:
Post a Comment