কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য দুঃসংবাদ: বিনা অনুমতিতে ভিডিও করলে ৯০ দিনে দ্রুত বিচার
কনটেন্ট ক্রিয়েটর' বা ভ্লগার পরিচয়ে রাস্তাঘাটে বা ব্যক্তিগত পরিসরে সাধারণ মানুষের অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করলে এখন থেকে কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হবে। নতুন পাস হওয়া 'সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬'-এর আওতায় এ ধরনের অপরাধের তদন্ত ৯০ দিনের মধ্যে শেষ করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে সরকার।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে নেত্রকোণা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম হিলালীর এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এই তথ্য জানান। সাম্প্রতিক সময়ে কনটেন্ট নির্মাণের নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের মতো ঘটনা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সরকারের এই অবস্থানকে অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংসদে মন্ত্রীর স্পষ্ট বার্তা
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের পক্ষ থেকে নেওয়া কঠোর আইনি পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম সংসদকে জানান, ডিজিটাল স্পেসে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন, "কনটেন্ট ক্রিয়েটর পরিচয়ে মোবাইল বা ক্যামেরায় অনুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তির ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা সম্পূর্ণ বেআইনি। এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া মাত্রই সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬ অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে অপরাধীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হবে।"
কী আছে নতুন 'সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬'-এ?
গত ১০ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদে যুগান্তকারী 'সাইবার সুরক্ষা বিল, ২০২৬' পাস হয়। এই আইনের বিভিন্ন ধারায় ডিজিটাল হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। মন্ত্রী তার বক্তব্যে আইনের ধারাগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন:
• অপরাধের ধরন (ধারা ২৫-এর ১): ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন বা সেক্সটরশনের (Sextortion) অভিপ্রায়ে কোনো তথ্য, ভিডিও, চিত্র বা যেকোনো উপাদান প্রকাশ, প্রচার বা প্রচারের হুমকি দেওয়া একটি আমলযোগ্য অপরাধ। ক্ষতিকর কনটেন্ট বা ভীতি প্রদর্শনও এই ধারার অন্তর্ভুক্ত।
• সাধারণ শাস্তি (ধারা ২৫-এর ২): উপরোক্ত অপরাধ প্রমাণিত হলে দোষী ব্যক্তিকে অনধিক ২ বছরের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।
• নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি (ধারা ২৫-এর ৩): ভুক্তভোগী যদি নারী অথবা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু হয়, তবে আইনের প্রয়োগ হবে আরও কঠোর। এক্ষেত্রে অপরাধীর অনধিক ৫ বছরের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
Read More -
চাঁদাবাজি ও প্রতারণার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স
ভিডিও ধারণ করে মুছে ফেলার বিনিময়ে বা ভাইরাল করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করার ঘটনাও আজকাল অহরহ ঘটছে। এ বিষয়ে মন্ত্রী স্পষ্ট করে জানান, চাঁদা দাবির বিষয়টি সরাসরি ধারা ২২ (সাইবার স্পেসে প্রতারণা)-এর আওতায় পড়বে। এই ধারায় ডিজিটাল প্রতারণা ও চাঁদাবাজির জন্য অনধিক ৫ বছরের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের কঠোর বিধান রাখা হয়েছে।
জনমনে স্বস্তি
রাস্তাঘাটে প্রাঙ্ক ভিডিও (Prank Video), রোস্টিং বা ভ্লগিংয়ের নামে সাধারণ মানুষকে, বিশেষ করে নারীদের বিনা অনুমতিতে ক্যামেরাবন্দী করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার একটি অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছিল। লাইক, কমেন্ট ও ভিউয়ের আশায় মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা (Privacy) ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছিল প্রতিনিয়ত। প্রযুক্তি বিশ্লেষক ও অধিকারকর্মীরা বলছেন, নতুন এই আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং ৯০ দিনের মধ্যে দ্রুত বিচারের বিধান কনটেন্ট নির্মাণের নামে এই সাইবার হয়রানি ও ডিজিটাল বুলিং অনেকাংশেই কমিয়ে আনবে।
Comments
Post a Comment