
চট্টগ্রামে ভয়াবহ বন্যা: টিনের চালে আশ্রয়, ৭ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি, ত্রাণ না পেয়ে বাড়ছে মানবিক সংকট
নিজস্ব প্রতিবেদক | চট্টগ্রাম | ১১ জুলাই ২০২৬
চট্টগ্রামে টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্টি হওয়া ভয়াবহ বন্যা এখন এক গভীর মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে। জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখনও পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলা, যেখানে হাজার হাজার পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছে উঁচু স্থানে, আশ্রয়কেন্দ্রে কিংবা নিজেদের বাড়ির টিনের ছাদে। অনেক এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছায়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ১৬টি উপজেলা ও মহানগরের বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভা মিলিয়ে মোট ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯০ জন মানুষ পানিবন্দি ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পানির নিচে রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাতকানিয়া ও বাঁশখালীতে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি
বন্যার সবচেয়ে বড় আঘাত নেমে এসেছে সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলায়। সাতকানিয়ার ১৭টি ইউনিয়নের প্রতিটিই পানির নিচে চলে গেছে। শুধু এই উপজেলাতেই চার লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। অনেক গ্রামে কোমর থেকে বুকসমান পানি জমে আছে। স্থানীয় সড়ক, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কৃষিজমি সবই বন্যার পানিতে ডুবে গেছে।
অন্যদিকে বাঁশখালীর কাথারিয়া, বড়ইতলী, গণ্ডামারা, ডোমরা, কদমরসূল, খানখানাবাদ, বাহারছড়া, চাম্বল, ছনুয়া, শেখেরখীল, সরল, রায়ছাটা ও পুঁইছড়িসহ উপকূলীয় বিস্তীর্ণ এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। অনেক একতলা বাড়ি পুরোপুরি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অসংখ্য কাঁচা ঘর ধসে পড়েছে এবং আধাপাকা বাড়ির নিচতলা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
বন্যাকবলিত বহু এলাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে নিজেদের বাড়ির টিনের ছাদে কিংবা উঁচু বারান্দায় আশ্রয় নিয়েছেন। অনেক পরিবার ছোট শিশু ও বৃদ্ধ সদস্যদের নিয়ে দিনের পর দিন মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।
পানির কারণে রান্নাঘর ডুবে যাওয়ায় খাবার রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। শুকনো খাবার শেষ হয়ে যাওয়ার পর অনেক পরিবার না খেয়ে বা অল্প খাবারে দিন পার করছে। বিশুদ্ধ পানির সংকটও দিন দিন তীব্র হচ্ছে। নিরাপদ পানির অভাবে ডায়রিয়া ও পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অনেক এলাকায় পাঁচ দিনের বেশি সময় ধরে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে দুর্গত মানুষ আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতেও পারছেন না।
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অভিযোগ—সব জায়গায় পৌঁছায়নি ত্রাণ
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রশাসন ও বিভিন্ন সংস্থার ত্রাণ কার্যক্রম শুরু হলেও দুর্গম অনেক এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত সহায়তা পৌঁছায়নি।
বাঁশখালীর ছনুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আনোয়ার সাঈফী জানান, তাদের এলাকায় অধিকাংশ পরিবার এখনও পানিবন্দি। ঘরে রান্না করা যাচ্ছে না এবং বিশুদ্ধ পানির সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সরকারি ত্রাণও প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত।
একই ধরনের অভিযোগ এসেছে সাতকানিয়া, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, বোয়ালখালী, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশের বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকেও।
কৃষি, মৎস্য ও স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা
বন্যা শুধু বসতবাড়ি নয়, স্থানীয় অর্থনীতিতেও বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। হাজার হাজার একর কৃষিজমি পানির নিচে চলে গেছে। ধান, সবজি ও অন্যান্য মৌসুমি ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এছাড়া মাছের ঘের ও পুকুর ভেসে যাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন অসংখ্য ক্ষুদ্র মৎস্যচাষী। অনেক ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, দোকান ও স্থানীয় বাজারও বন্যার পানিতে ডুবে থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে এবং কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ পুনর্বাসন কর্মসূচি প্রয়োজন হবে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য: ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে
জেলা প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, বন্যায় এখন পর্যন্ত পাহাড়ধস, দেয়ালধস এবং পানিতে ডুবে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ৫ জন।
দুর্গত মানুষের জন্য সরকার ইতোমধ্যে ৭০০ মেট্রিক টন চাল এবং ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।
এ পর্যন্ত বিতরণ করা হয়েছে—
- ৩০০ মেট্রিক টন চাল
- ৪৩ লাখ টাকা
- ২২ হাজার ২৫০টি শুকনো খাবারের প্যাকেট
- ৯ হাজার ৮০০টি রান্না করা খাবারের প্যাকেট
এছাড়া জেলা প্রশাসনের কাছে আরও ৪০০ মেট্রিক টন চাল এবং ১৭ লাখ টাকা জরুরি সহায়তা হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।
প্রশাসনের স্বীকারোক্তি—সব জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা স্বীকার করেছেন যে এখনও সব দুর্গত মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক দুর্গম এলাকায় সাধারণ নৌকাও প্রবেশ করতে পারছে না। তাই সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় স্পিডবোট ব্যবহার করে উদ্ধার ও ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।
তিনি জানান, জেলার বিভিন্ন স্থানে ৬৭০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ২৩ হাজার ৮৫০ জন সেখানে অবস্থান করছেন। আশ্রয়কেন্দ্রে শুকনো খাবারের পাশাপাশি রান্না করা খাবারও সরবরাহ করা হচ্ছে।
সেনাবাহিনী, কোস্টগার্ড ও উদ্ধারকারী বাহিনীর তৎপরতা
বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্ধার কার্যক্রম চালাচ্ছে।
বিশেষ করে সাতকানিয়া, বোয়ালখালী, হাটহাজারী ও ফটিকছড়িতে সেনাবাহিনী উদ্ধারকাজে সক্রিয় রয়েছে। উপকূলীয় সন্দ্বীপ এলাকায় সহায়তা করছে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড।
এছাড়া ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যরা দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
শনিবার থেকে দুর্গম এলাকায় স্পিডবোট ব্যবহার করে উদ্ধার অভিযান আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
পানি নামলেও সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী কয়েক দিনে বৃষ্টিপাত কিছুটা কমতে পারে। এতে ধীরে ধীরে পাহাড়ি ঢলের পানি নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে পানি কমে গেলেও সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ, কৃষিজমি পুনরুদ্ধার, বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করা এবং পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধ এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হয়ে উঠবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু না হলে দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
মানবিক সংকট এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা
চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি শুধুমাত্র একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি দ্রুত একটি বড় মানবিক সংকটে পরিণত হচ্ছে। বহু পরিবার দিনের পর দিন নিরাপদ খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবার বাইরে রয়েছে।
বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী, বৃদ্ধ এবং অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। দুর্গম এলাকায় দ্রুত উদ্ধার ও পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
যত দ্রুত দুর্গত মানুষের কাছে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ এবং নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা যাবে, তত দ্রুত এই মানবিক সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
Tage
চট্টগ্রাম বন্যা ২০২৬, Chattogram Flood 2026, সাতকানিয়া বন্যা, বাঁশখালী বন্যা, চট্টগ্রামে পানিবন্দি মানুষ, বাংলাদেশ বন্যা সংবাদ, Flood News Bangladesh, Relief News Bangladesh, Chattogram Flood Relief

