১৯৮৮ সালের চট্টগ্রাম গণহত্যা এবং ২৬ জানুয়ারির ঐতিহাসিক প্রতিবাদ: একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও ২০২৬ সালের প্রেক্ষিত
১. ভূমিকা: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও ২০২৬ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষিত
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৮৮ সালের জানুয়ারি মাসটি একটি গভীর, রক্তাক্ত এবং একইসঙ্গে যুগান্তকারী রাজনৈতিক পালাবদলের অধ্যায় হিসেবে পরিগণিত হয়। সামরিক স্বৈরাচার হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের যে দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছিল, তাতে এই মাসটির প্রভাব সুদূরপ্রসারী । বিশেষ করে ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার গাড়িবহরে পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণ, এবং এর ঠিক দুই দিন পর ২৬ জানুয়ারি ঢাকায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ মিছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে অভূতপূর্ব এক রাজনৈতিক মেরুকরণ ও ঐক্যের জন্ম দেয় ।
বর্তমান ২০২৬ সালের আধুনিক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে এই ঘটনার বিশ্লেষণ করলে এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি বা নিছক পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এটি ক্ষমতা, স্বৈরতন্ত্র, রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগ, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক সহাবস্থানের এক অতি-জটিল আখ্যান হিসেবে সামনে আসে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং শেখ হাসিনা সরকারের নাটকীয় পতনের পর , ১৯৮৮ সালের ঘটনাগুলোর পুনর্মূল্যায়ন ইতিহাসের এক অমোঘ বিপ্রতীপ বাস্তবতাকে (Historical Irony) অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে স্পষ্ট করে তোলে। ১৯৮৮ সালে যিনি ছিলেন রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের প্রধান শিকার এবং যাকে বাঁচাতে সাধারণ কর্মীরা 'মানব ঢাল' তৈরি করেছিল , ২০২৪ সালে তিনিই রূপান্তরিত হয়েছিলেন এক ভয়ংকর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নির্দেশদাতায় ।
এই বিস্তৃত ও গভীর গবেষণাধর্মী প্রতিবেদনে ১৯৮৮ সালের ২৪ ও ২৬ জানুয়ারির ঘটনার প্রামাণ্য বিবরণ, হতাহতের বহুস্তরিক পরিসংখ্যান, আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা এবং এর সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক তাৎপর্য ২০২৬ সালের রাজনৈতিক গবেষক, নীতিনির্ধারক এবং সাধারণ পাঠকদের জন্য বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
Read More - ইউনূস সরকারের ১৪ মাসে ঋণ বেড়েছে ২.৬০ লাখ কোটি টাকা
২. স্বৈরতন্ত্রের উত্থান এবং ১৯৮০-এর দশকের রাজনৈতিক পটভূমি
১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারির ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘ সামরিক শাসন ও গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের এক অনিবার্য পরিণতি। এর শিকড় নিহিত ছিল ১৯৮২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্যে।
২.১. সামরিক শাসন ও বৈধতার সংকট (১৯৮২-১৯৮৬)
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এক রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করে তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন । ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই তিনি সংবিধান স্থগিত করেন এবং দেশব্যাপী সামরিক শাসন (Martial Law) জারি করেন, নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (CMLA) হিসেবে ঘোষণা করেন । সামরিক শাসনামলে ব্যাপক দুর্নীতি, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক অধিকার হরণের মাধ্যমে তিনি একটি নিবর্তনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্র কায়েম করেন।
নিজের ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী এবং বৈধতা প্রদানের উদ্দেশ্যে এরশাদ ১৯৮৬ সালে রাজনৈতিক দল 'জাতীয় পার্টি' গঠন করেন এবং নির্বাচনের আয়োজন করেন । সেই সংসদীয় নির্বাচন বিএনপি বর্জন করলেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করেছিল, যা নির্বাচনটিকে কিছুটা আইনি বৈধতা দিলেও ব্যাপক ভোট কারচুপির কারণে তা দেশে-বিদেশে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয় । পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়েই প্রার্থী দিতে অস্বীকৃতি জানায়, যেখানে এরশাদ ৮৪% ভোট পাওয়ার দাবি করে নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে অধিষ্ঠিত করেন ।
২.২. নূর হোসেনের আত্মদান এবং আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ (১৯৮৭)
সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন তীব্রতর হতে থাকে ১৯৮৭ সালের শেষের দিকে। এই আন্দোলনের একটি মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা ঘটে ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর। ঢাকায় এরশাদবিরোধী 'ঢাকা অবরোধ' বা সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে পুলিশের গুলিতে আওয়ামী লীগের যুবলীগ কর্মী নূর হোসেন, বাবুল এবং ফাত্তাহ নিহত হন । নূর হোসেনের বুকে ও পিঠে লেখা ছিল "স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক", যা পুরো দেশের মানুষকে আবেগাপ্লুত ও ক্ষুব্ধ করে তোলে। এই ঘটনার পর বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় যে, বাধ্য হয়ে এরশাদ ১৯৮৭ সালের ৬ ডিসেম্বর সংসদ ভেঙে দেন ।
নিজেকে পুনরায় বৈধতা দিতে এরশাদ ১৯৮৮ সালের ৪ মার্চ নতুন নির্বাচনের ঘোষণা দেন । কিন্তু এবার বিএনপির নেতৃত্বাধীন ৭-দলীয় জোট, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ৮-দলীয় জোট এবং বামপন্থী ৫-দলীয় জোট সর্বসম্মতিক্রমে এই নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয় । দেশব্যাপী নির্বাচন প্রতিহত করার লক্ষ্যে বিরোধী দলগুলো দুর্বার আন্দোলন ও জনসভার কর্মসূচি গ্রহণ করে। এই গণজাগরণের অংশ হিসেবেই শেখ হাসিনা দেশব্যাপী সফরের অংশ হিসেবে চট্টগ্রামে একটি বিশাল জনসভার কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
৩. ২৪ জানুয়ারি ১৯৮৮: চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে রক্তস্নাত অধ্যায়
১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে একটি কালো দিন হিসেবে চিহ্নিত। এই দিনে রাষ্ট্রযন্ত্র তার সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টা চালিয়েছিল।
৩.১. সমাবেশের প্রস্তুতি এবং জনসমুদ্র
২৪ জানুয়ারি সকালে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা থেকে বিমানে করে চট্টগ্রামে পৌঁছান । বিমানবন্দর থেকে তাকে নিয়ে একটি বিশাল গাড়িবহর ও মিছিল শহরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে এই জনসভার আয়োজন করা হয়েছিল । লালদীঘি ময়দান ঐতিহাসিকভাবেই চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সমাবেশের কেন্দ্রবিন্দু; ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান এই মাঠেই তার ঐতিহাসিক ছয় দফার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন । হাজার হাজার মানুষ স্বৈরাচার বিরোধী স্লোগান দিয়ে শেখ হাসিনার এই জনসভায় যোগ দেয়।
৩.২. কোতোয়ালি মোড়ের ব্যারিকেড ও আকস্মিক আক্রমণ
জনসভায় ভাষণ প্রদান শেষে শেখ হাসিনা একটি খোলা ট্রাকে করে বিশাল মিছিল নিয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন । মিছিলটি যখন কোতোয়ালি থানার অদূরে কোতোয়ালি মোড়ে পৌঁছায়, তখন পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে মোড় নেয়। পুলিশ সেখানে আগে থেকেই ভারী ব্যারিকেড দিয়ে পথ অবরোধ করে রেখেছিল । মিছিলে অংশগ্রহণকারী জনসমুদ্র যখন সেই ব্যারিকেড সরিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে সামনে এগোতে চায়, ঠিক তখনই তৎকালীন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার মির্জা রকিবুল হুদা সম্পূর্ণ বিনা উসকানিতে পুলিশ বাহিনীকে মিছিলে সরাসরি গুলি চালানোর নির্দেশ দেন ।
পুলিশের এই গুলিবর্ষণ কোনো সতর্কতামূলক বা জনতা ছত্রভঙ্গ করার উদ্দেশ্যে রাবার বুলেট বা কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ছিল না; এটি ছিল সরাসরি হত্যার উদ্দেশ্যে প্রাণঘাতী স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ব্যবহার। মুসলিম ইনস্টিটিউট, কে. সি. দে রোড, নন্দনকানন, আমতলা এবং কোর্ট বিল্ডিং এলাকাজুড়ে এই বীভৎস হত্যাযজ্ঞ ছড়িয়ে পড়ে ।
৩.৩. 'মানব ঢাল': রাজনৈতিক আত্মত্যাগের অনন্য উপাখ্যান
এই ভয়াবহ আক্রমণের মূল লক্ষ্যবস্তু ছিলেন শেখ হাসিনা। পুলিশের বন্দুকের নল যখন সরাসরি শেখ হাসিনার দিকে তাক করা এবং বৃষ্টির মতো গুলি বর্ষিত হচ্ছিল, তখন রাজনৈতিক আনুগত্য এবং আত্মত্যাগের এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়। আওয়ামী লীগের অসংখ্য তৃণমূল নেতাকর্মী শেখ হাসিনাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেন এবং নিজেদের জীবন বাজি রেখে একটি "মানব ঢাল" (Human Wall) তৈরি করেন ।
এই মানব ঢাল কোনো রূপক শব্দ ছিল না। কর্মীরা আক্ষরিক অর্থেই তাদের নেত্রীর সামনে বুক পেতে দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা ট্রাকের ওপর থেকে বারবার পুলিশকে গুলি বন্ধ করার জন্য চিৎকার করে অনুরোধ জানালেও পুলিশ তাতে বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করেনি । বরং মানব ঢালে থাকা কর্মীদের ভেদ করে গুলি শেখ হাসিনা পর্যন্ত পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়। এই মানব ঢালের কারণেই শেখ হাসিনা সেদিন অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান, কিন্তু পুলিশের গুলিতে ট্রাকের ওপরে এবং রাজপথে লুটিয়ে পড়েন অসংখ্য সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক কর্মী।
৩.৪. হত্যাযজ্ঞের বিস্তৃতি এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ভূমিকা
এই হত্যাযজ্ঞে সিএমপি কমিশনার মির্জা রকিবুল হুদার নির্দেশে যারা সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন পরিদর্শক গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডল, কনস্টেবল প্রদীপ বড়ুয়া, কনস্টেবল মমতাজউদ্দিন, কনস্টেবল মোস্তাফিজুর রহমান, কনস্টেবল শাহ আবদুল্লাহ, কনস্টেবল বশির আহমেদ এবং কনস্টেবল আবদুস সালাম । প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে এবং পরবর্তীতে আদালতে দেওয়া আওয়ামী লীগ নেতা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের সাক্ষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল শেখ হাসিনাকে হত্যার একটি "পূর্বপরিকল্পিত" ষড়যন্ত্র (Premeditated plan) ।
৩.৫. লাশ গুমের অপচেষ্টা এবং ধর্মীয় পরিচয়ের অবমাননা
যেকোনো রাষ্ট্রীয় হত্যাযজ্ঞের পর প্রমাণ লোপাট করা স্বৈরাচারী সরকারগুলোর একটি সাধারণ প্রবৃত্তি। চট্টগ্রামের এই গণহত্যার পর পুলিশ নিহতদের মৃতদেহগুলো তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেনি। পরিবর্তে, মৃতদেহগুলো তড়িঘড়ি করে একটি স্থানীয় শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং নিহতদের ধর্মীয় পরিচয় (মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টান) সম্পূর্ণরূপে অগ্রাহ্য করে একসাথে পুড়িয়ে ফেলা হয় । পরিবারের সদস্যদের শেষবারের মতো তাদের প্রিয়জনের মুখ দেখার সুযোগ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। সাংবাদিকদের শ্মশানে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয় । এই অমানবিক পদক্ষেপ কেবল মানবাধিকারেরই চরম লঙ্ঘন ছিল না, বরং এটি ছিল রাষ্ট্রীয় অপরাধ ঢাকার এক নির্লজ্জ প্রয়াস।
৪. হতাহতের পরিসংখ্যান: রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা বনাম ঐতিহাসিক সত্য
স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত পরিসংখ্যান সাধারণত ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ১৯৮৮ সালের চট্টগ্রাম গণহত্যার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। নিহত ও আহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ব্যাপক মতপার্থক্য পরিলক্ষিত হয়, যা তথ্যের রাজনীতিকরণকে নির্দেশ করে।
| পরিসংখ্যানের উৎস | নিহতের সংখ্যা | আহতের সংখ্যা | তথ্যসূত্র |
| রাষ্ট্রীয়/সরকারি হিসাব (এরশাদ সরকার) | ৯ জন | অজ্ঞাত | |
| আদালত ও আইনি নথিপত্র | কমপক্ষে ২৪ জন | শতাধিক | |
| শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত দাবি | ৩৩ জন | শতাধিক | |
| আওয়ামী লীগের প্রাতিষ্ঠানিক দাবি | প্রায় ৪০ জন | শতাধিক | |
| আওয়ামী লীগের ওয়েবসাইট (ভিন্ন সূত্র) | ৮০ জন | শতাধিক |
৪.১. তথ্যের রাজনীতিকরণ ও পরিসংখ্যানের বিশ্লেষণ
উপর্যুক্ত সারণি থেকে এটি স্পষ্ট যে, তৎকালীন এরশাদ সরকার নিহতের সংখ্যা মাত্র ৯ জন বলে দাবি করেছিল, যা ছিল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং দেশের জনগণের কাছে ঘটনাটিকে একটি সাধারণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি হিসেবে লঘু করে দেখানোর রাষ্ট্রীয় অপকৌশল ।
অন্যদিকে, দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় এবং আদালতের রায়ে অন্তত ২৪ জন নিহতের বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে । তবে রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব পরিসংখ্যানে এই সংখ্যা অনেক বেশি। শেখ হাসিনা স্বয়ং দাবি করেছিলেন যে, সেই হত্যাযজ্ঞে ৩৩ জন নেতাকর্মী নিহত হন । দলীয় বিভিন্ন প্রচারপত্র ও প্রকাশনায় এই সংখ্যা প্রায় ৪০ থেকে ৮০ জন পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে । প্রকৃত সংখ্যা যাই হোক না কেন, এটি অনস্বীকার্য যে ২৪ জানুয়ারির ঘটনাটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে গণতান্ত্রিক জমায়েতের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণের অন্যতম বৃহৎ এবং সুপরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ।
৫. বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও ৩২ বছরের আইনি লড়াই
১৯৮৮ সালের এই ভয়াবহ গণহত্যার পর দীর্ঘ সময় এর কোনো বিচার হয়নি। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে এরশাদ সরকারের পতন ঘটলেও স্বৈরাচারের দোসররা রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন স্তরে বহাল তবিয়তে ছিল । এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবের একটি ধ্রুপদী উদাহরণ।
৫.১. মামলার সূচনা এবং রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা
গণহত্যার পর প্রায় চার বছর কেউ মামলা করার সাহস পায়নি। এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। অবশেষে ১৯৯২ সালের ৫ মার্চ আইনজীবী শহীদুল হুদা বাদী হয়ে তৎকালীন সিএমপি কমিশনার মির্জা রকিবুল হুদাসহ ৪৬ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন । কিন্তু যেহেতু অভিযুক্তরা ছিলেন ক্ষমতাশালী পুলিশ কর্মকর্তা এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের অংশ, তাই প্রাথমিক পর্যায়ে আদালত মামলাটি খারিজ করে দেয় ।
৫.২. অভিযোগ গঠন, সাক্ষীদের ভীতি এবং দীর্ঘসূত্রিতা
১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর এই মামলার তদন্ত পুনরুজ্জীবিত হয়। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত শেষে ১৯৯৭ সালের ১২ ডিসেম্বর এবং পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালের ৩ ডিসেম্বর পরিপূরক চার্জশিট দাখিল করে ।
২০০০ সালের ৯ মে আদালত ৪৬ জন আসামির মধ্যে মাত্র ৮ জন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে । কিন্তু বিচার প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতিতে চলতে থাকে। ২০০১ সালে ক্ষমতার পালাবদল এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে মামলাটি হিমঘরে চলে যায়। ২০০৩ সালে বেশ কয়েকজন অভিযুক্ত জামিনে মুক্তি লাভ করে। বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার ভীতি এতটাই প্রবল ছিল যে, ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর কোনো সাক্ষী আদালতে হাজিরা দিতে আসেননি । বাদী শহীদুল হুদা ২০০৫ সালে মারা গেলে তার ছেলে এরশাদ হোসেন মামলার বাদী হিসেবে স্থলাভিষিক্ত হন ।
৫.৩. ২০২০ সালের চূড়ান্ত রায় এবং অপূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচার
দীর্ঘ ৩২ বছর পর, ২০২০ সালের ২০ জানুয়ারি চট্টগ্রামের একটি আদালত (জেলা ও দায়রা জজ ইসমাইল হোসেন) এই মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করে। রায়ে ৫ জন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয় ।
তবে এই বিচারিক প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার বলা যায় কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কারণ প্রধান নির্দেশদাতা আসামি মির্জা রকিবুল হুদা এবং দুই কনস্টেবল বশির আহমেদ ও আবদুস সালাম বিচার চলাকালীন সময়েই স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেন । ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে পরিদর্শক গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডল পলাতক থাকেন । দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় পর পাওয়া এই রায় বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটালেও, নিহতদের পরিবারগুলোর কাছে তা ছিল "জাস্টিস ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড" (Justice delayed is justice denied)-এর এক নির্মম বাস্তবতা।
৬. ২৬ জানুয়ারি ১৯৮৮: শহীদ মিনারের ঐতিহাসিক প্রতিবাদ ও অভাবনীয় রাজনৈতিক সমীকরণ
চট্টগ্রাম গণহত্যার খবর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে সেন্সর করা হলেও তা সারা দেশে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে বিভক্ত বিরোধী দলগুলো তাৎক্ষণিকভাবে একটি বিন্দুতে ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় ২৬ জানুয়ারি ঢাকায় যে ঘটনা ঘটে, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত।
৬.১. শহীদ মিনারের সমাবেশ এবং শেখ হাসিনার অনুপস্থিতি
চট্টগ্রামের ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাতে ২৬ জানুয়ারি ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আওয়ামী লীগ এবং তৎকালীন ৮-দলীয় জোট একটি বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেয় । তবে আশ্চর্যজনকভাবে, যার গাড়িবহরে হামলা হয়েছিল এবং যিনি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিলেন, সেই শেখ হাসিনা ওই সমাবেশে উপস্থিত থাকতে পারেননি ।
শেখ হাসিনার এই অনুপস্থিতির সুনির্দিষ্ট কারণ ঐতিহাসিকভাবে স্পষ্টভাবে নথিভুক্ত না হলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে একাধিক কারণ ছিল। প্রথমত, ২৪ জানুয়ারির ভয়াবহ আক্রমণ থেকে মাত্র ৪৮ ঘণ্টা পার হওয়ায় চরম মানসিক ট্রমা এবং শারীরিক ক্লান্তি। দ্বিতীয়ত, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে ঢাকায় আরেকটি সম্ভাব্য গুপ্তহত্যার ব্যাপারে উচ্চমাত্রার নিরাপত্তা ঝুঁকি। তৃতীয়ত, এরশাদ সরকারের পুলিশি ঘেরাও বা গৃহবন্দী থাকার আশঙ্কা । ফলশ্রুতিতে, সমাবেশটি তার প্রধান আকর্ষণকে হারিয়ে কিছুটা নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ার শঙ্কায় ছিল।
READ - জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ: একটি বিশেষ প্রতিবেদন
৬.২. বেগম খালেদা জিয়ার ঐতিহাসিক উপস্থিতি ও মিছিলে নেতৃত্ব
ঠিক এমন একটি সংকটময় মুহূর্তে, সম্পূর্ণ অভাবনীয়ভাবে শহীদ মিনারের সমাবেশে উপস্থিত হন বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া । ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার আদর্শিক পার্থক্য এবং শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মধ্যকার তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সর্বজনবিদিত। কিন্তু সেই চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে, এরশাদের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এবং প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ শেখ হাসিনার ওপর রাষ্ট্রীয় হামলার প্রতিবাদে খালেদা জিয়ার এই অংশগ্রহণ সবাইকে বিস্মিত করেছিল ।
সমাবেশ শেষে বেগম খালেদা জিয়া স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পুলিশি হত্যাযজ্ঞের তীব্র নিন্দা জানান এবং শহীদ মিনার থেকে একটি বিশাল প্রতিবাদ মিছিলের নেতৃত্ব দেন । এটি ছিল সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক ধারার এক অঘোষিত কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী একীভূতকরণ।
৬.৩. প্রথম সারির নেতৃবৃন্দ ও আদর্শিক ঐক্যের স্বরূপ
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন এই ঐতিহাসিক মিছিলে আওয়ামী লীগ এবং অন্যান্য বামপন্থী ও প্রগতিশীল দলের অনেক শীর্ষ নেতা অংশগ্রহণ করেন। প্রাপ্ত ঐতিহাসিক স্থিরচিত্র এবং নথিপত্র প্রমাণ করে যে, এই মিছিলে খালেদা জিয়ার সাথে একই কাতারে পা মিলিয়ে হেঁটেছিলেন:
হাসানুল হক ইনু (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল)
রাশেদ খান মেনন (বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি)
শাজাহান খান (আওয়ামী লীগ/শ্রমিক নেতা)
শিরিন সুলতানা (বিএনপি নেত্রী)
শেখ ফজলুল করিম সেলিম (আওয়ামী লীগ নেতা ও শেখ হাসিনার আত্মীয়)
রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং আদর্শিক বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে এই নেতাদের একসঙ্গে রাজপথে হাঁটা প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সেদিন একটি দৃঢ়, ঐক্যবদ্ধ এবং অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল। এটি ছিল সেই মুহূর্ত, যখন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের বৃহত্তর স্বার্থে দলীয় ক্ষুদ্র স্বার্থকে বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল।
৭. রাজনৈতিক সহাবস্থান (Political Coexistence): একটি হারানো যুগের বিশ্লেষণ
১৯৮৮ সালের জানুয়ারি মাসের এই ঘটনাগুলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি সীমিত সময়ের জন্য হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'রাজনৈতিক সহাবস্থান' (Political Coexistence)-এর সূচনা করেছিল ।
৭.১. 'ব্যাটল অব দ্য বেগমস্'-এর ছায়ায় রাজনৈতিক শিষ্টাচার
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নব্বইয়ের দশকের বাংলাদেশের রাজনীতিকে প্রায়শই "ব্যাটল অব দ্য বেগমস্" (Battle of the Begums) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় । কিন্তু ১৯৮৮ সালের ২৬ জানুয়ারির ঘটনা প্রমাণ করে যে, এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা সর্বদা অন্ধ শত্রুতা ছিল না। স্বাধীনতার পর এটিই ছিল প্রথমবার, যখন দেশের প্রধান দুটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল একটি যৌথ রাজনৈতিক কাঠামোর আওতায় একে অপরের অস্তিত্বকে কেবল স্বীকৃতিই দেয়নি, বরং একে অপরের বিপদে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল ।
এই সহাবস্থান কেবল রাজপথের মিছিলেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এর ফলে উভয় দলের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে এক ধরনের রাজনৈতিক শিষ্টাচার এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়েছিল। সিনিয়র নেতারা প্রায়শই আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে মিলিত হতেন, যা প্রমাণ করত যে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা তখনও চূড়ান্ত শত্রুতায় পরিণত হয়নি ।
৭.২. সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে মিথস্ক্রিয়া
এই রাজনৈতিক সৌজন্যবোধের প্রতিফলন দেখা যায় পরবর্তী বছরগুলোর সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে। উদাহরণস্বরূপ, খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানের বিবাহোত্তর সংবর্ধনায় শেখ হাসিনা আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়েছিলেন । একইভাবে, ১৯৯৭ সালের ২৮ মার্চ খালেদা জিয়ার কনিষ্ঠ পুত্র আরাফাত রহমানের বিয়ের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে পাশাপাশি হাসিমুখে বসে থাকতে দেখা যায় । এছাড়া সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও এই দুই নেত্রীকে একসঙ্গে দেখা যেত, যা দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি স্থিতিশীলতার বার্তা প্রদান করত।
দুঃখজনকভাবে, পরবর্তী দশকগুলোতে, বিশেষ করে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আবর্তে এই সহাবস্থানের সংস্কৃতি সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে যায়।
৮. ঐতিহাসিক বিপ্রতীপতা (Historical Irony): ১৯৮৮ থেকে ২০২৪
বর্তমান ২০২৬ সালের দৃষ্টিকোণ থেকে ১৯৮৮ সালের এই ঘটনার রাজনৈতিক তাৎপর্য বিশ্লেষণ করতে গেলে একটি গভীর, বিষাদময় এবং চমকপ্রদ 'ঐতিহাসিক বিপ্রতীপতা' বা Historical Irony সামনে চলে আসে। সময়ের পরিক্রমায় কীভাবে একজন নির্যাতিত বিরোধীদলীয় নেতা নিজেই একটি ভয়াবহ স্বৈরতান্ত্রিক ও নিবর্তনমূলক ব্যবস্থার প্রধান হয়ে ওঠেন, তার নিখুঁত এবং মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত হলো শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বিবর্তন।
৮.১. জুলাই-আগস্ট ২০২৪: গণঅভ্যুত্থান এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের নতুন মাত্রা
১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি শেখ হাসিনা ছিলেন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নিরুপায় শিকার। এরশাদ সরকারের পুলিশ তার ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছিল এবং তাকে বাঁচাতে দলীয় কর্মীরা 'মানব ঢাল' তৈরি করে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন । সেসময় শেখ হাসিনা বারবার পুলিশকে গুলি থামাতে ব্যাকুল অনুরোধ করেছিলেন।
কিন্তু এর ঠিক ৩৬ বছর পর, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে, টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার সরকার, তার অধীনস্থ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী (পুলিশ, র্যাব, এপিবিএন, বিজিবি) এবং দলীয় অঙ্গসংগঠন (ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ) বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের ওপর ইতিহাসের অন্যতম বর্বর গণহত্যা চালায় । যা শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের একটি যৌক্তিক দাবি হিসেবে, তা সরকারের অহমিকা এবং অতিমাত্রায় বলপ্রয়োগের কারণে একটি পূর্ণাঙ্গ "মনসুন রেভোলিউশন" (Monsoon Revolution) বা "জেন-জি বিপ্লবে" (Gen Z Revolution) রূপ নেয় ।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের (OHCHR) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে শেখ হাসিনা সরকারের নির্দেশে প্রায় ১৪০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয় এবং বিশ হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয় । এই নিহতদের মধ্যে প্রায় ১২-১৩ শতাংশই ছিল শিশু । অন্যদিকে স্টুডেন্টস এগেইনস্ট ডিসক্রিমিনেশন (SAD) এবং মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের মতে নিহতের সংখ্যা ১৫৮১ জন । ১৯৮৮ সালে পুলিশের গুলিতে যেখানে ২৪ জন নিহত হয়েছিল, ২০২৪ সালে সেই পুলিশ বাহিনীই ওয়ாரி, উত্তরা, মিরপুর এবং যাত্রাবাড়ীকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করে; কেবল ওয়ாரி এলাকাতেই ১০৭ জন নিহত হয় ।
| তুলনার ক্ষেত্র | ২৪ জানুয়ারি ১৯৮৮ | জুলাই-আগস্ট ২০২৪ |
| রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান | হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ | শেখ হাসিনা |
| আক্রান্ত পক্ষ | শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ | ছাত্র-জনতা ও বিরোধী দল |
| হামলাকারী বাহিনী | পুলিশ (সিএমপি) | পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, ছাত্রলীগ, যুবলীগ |
| নিহতের সংখ্যা | ২৪ - ৮০ জন | ১৪০০ - ১৫৮১ জন |
| শেখ হাসিনার ভূমিকা | ভুক্তভোগী এবং মানব ঢালের আশ্রিত | নির্দেশদাতা এবং স্বৈরাচারী শাসক |
| ফলাফল | ১৯৯০ সালে এরশাদের পতন | ৫ আগস্ট ২০২৪-এ শেখ হাসিনার দেশত্যাগ |
৮.২. আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধ এবং নতুন প্রজন্মের আত্মদান
১৯৮৮ সালে যারা শেখ হাসিনাকে বাঁচাতে মানব ঢাল তৈরি করে প্রাণ দিয়েছিল, তাদের সেই আত্মত্যাগের চেতনা ২০২৪ সালে ভিন্ন আঙ্গিকে ফিরে আসে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ পুলিশের বন্দুকের নলের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন । এটি ছিল ১৯৮৮ সালের মানব ঢালের এক আধুনিক ও একক রূপান্তর, যেখানে নাগরিক বুক পেতে দিচ্ছে স্বৈরাচারের বুলেটের সামনে। একইভাবে, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ, যিনি আন্দোলনকারীদের মাঝে পানি বিতরণ করছিলেন, অচেনা স্নাইপারের গুলিতে নিহত হন । ১৯৮৮ সালে যিনি পুলিশের গুলি থেকে বাঁচতে মানব ঢালের আশ্রয় নিয়েছিলেন, ২০২৪ সালে তিনিই রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর হেলিকপ্টার ও স্নাইপার থেকে গুলিবর্ষণের নির্দেশদাতা হিসেবে পরিগণিত হন ।
৮.৩. আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং নিয়তির পরিহাস
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো বিচারিক প্রক্রিয়ার পটপরিবর্তন। ১৯৮৮ সালের গণহত্যার বিচার চেয়ে শেখ হাসিনা ১৯৯২ সালে মামলা করেছিলেন এবং দীর্ঘ ৩২ বছর পর ২০২০ সালে সেই মামলার রায় তার সরকারের আমলেই কার্যকর হয় । অথচ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর , শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (International Crimes Tribunal) মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার অভিযোগে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এই ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে ৮৪৮ জন দলীয় নেতাকর্মীকে হত্যার অভিযোগে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছে । ট্রাইব্যুনাল ইতিমধ্যে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গণগ্রেপ্তার, গুম এবং গণহত্যার দায়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে এবং ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড অ্যালার্ট জারির প্রক্রিয়া গ্রহণ করেছে । একজন ভুক্তভোগী থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান আসামিতে পরিণত হওয়ার এই ট্র্যাজেডি রাজনীতি বিজ্ঞানের একটি ধ্রুপদী গবেষণার বিষয়।
৯. আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়: মির্জা রকিবুল হুদা থেকে ২০২৪
এই গবেষণা থেকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবক্ষয়ের একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা পাওয়া যায়। ১৯৮৮ সালে সিএমপি কমিশনার মির্জা রকিবুল হুদা যেভাবে তার বাহিনী ব্যবহার করে বিনা উসকানিতে রাজনৈতিক সমাবেশে গুলি চালিয়েছিলেন , তা ছিল পুলিশ বাহিনীকে দলীয় ক্যাডার হিসেবে ব্যবহারের একটি প্রাথমিক রূপ।
২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরের শাসনামলে শেখ হাসিনা পুলিশ এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (RAB)-কে সম্পূর্ণরূপে একটি দলীয় হাতিয়ারে পরিণত করেছিলেন। জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ক্র্যাকডাউন কোনো স্বতঃস্ফূর্ত বিশৃঙ্খলা ছিল না; এটি ছিল "ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার জন্য সাবেক সরকারের একটি সুপরিকল্পিত এবং সুসমন্বিত কৌশল" । বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম এবং নির্বিচার গুলি চালানোর এই অপসংস্কৃতি প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ওপর গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত না হলে তারা যেকোনো সময় জনগণের বিরুদ্ধে মারণাস্ত্রে পরিণত হতে পারে।
১০. উপসংহার ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রূপরেখা
১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানের গণহত্যা এবং ২৬ জানুয়ারি ঢাকায় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সংঘটিত ঐতিহাসিক প্রতিবাদ মিছিল—উভয় ঘটনাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে অত্যন্ত গভীর, জটিল এবং পরিপূরক অর্থ বহন করে। প্রথম ঘটনাটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নির্লজ্জ অপব্যবহার, বিচারহীনতা এবং স্বৈরতন্ত্রের নিষ্ঠুরতাকে চিত্রিত করে, যেখানে ক্ষমতালিপ্সু শাসক তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করতে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে। অন্যদিকে, দ্বিতীয় ঘটনাটি রাজনৈতিক শিষ্টাচার, আদর্শিক ভিন্নতার মাঝেও গণতান্ত্রিক সহাবস্থান এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে অভাবনীয় জাতীয় ঐক্যের অসীম শক্তির প্রমাণ দেয়।
২০২৬ সালের পাঠকদের কাছে এই ইতিহাস কেবল অতীত রোমন্থন নয়, বরং এটি একটি জ্বলন্ত সতর্কবার্তা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, ক্ষমতার নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার (Checks and balances) অভাব যেকোনো গণতান্ত্রিক নেতাকে ভয়ংকর স্বৈরাচারে রূপান্তরিত করতে পারে, যেমনটি শেখ হাসিনার চার দশকের রাজনৈতিক জীবনের ট্র্যাজেডিতে প্রতিফলিত হয়েছে। ১৯৮৮ সালে যে তরুণরা শেখ হাসিনাকে বাঁচাতে মানব ঢাল তৈরি করে প্রাণ দিয়েছিল, তাদের আত্মত্যাগ এবং ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার সরকারের গুলিতে প্রাণ হারানো আবু সাঈদ, মুগ্ধ বা ওয়াসিম আকরামদের আত্মত্যাগ—মূলত একই সুতোয় গাঁথা। উভয় প্রজন্মই প্রাণ দিয়েছে একটি শোষণমুক্ত, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায়।
ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে যদি অতীতের এই রক্তক্ষয়ী ও প্রতিহিংসাপরায়ণ আবর্ত থেকে চিরতরে বের করে আনতে হয়, তবে ১৯৮৮ সালের ২৬ জানুয়ারির মতো রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের রাজনীতিকে পুনরায় ধারণ করতে হবে। একইসাথে, বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ এবং পুলিশসহ সকল রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে একটি স্বাধীন, পেশাদার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা জরুরি। স্বৈরাচার ও রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে সকল গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের মাধ্যমেই কেবল একটি সুস্থ ও স্থিতিশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মাণ করা সম্ভব, যা হবে ২০২৬ এবং তার পরবর্তী ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের মূল রক্ষাকবচ।
©All rights Reserve GenzFrontier | privacy-policy

Comments
Post a Comment