ছবি: ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের সদ্য পদত্যাগকারী চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল জাবের (বামে) এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট ফাতিমা তাসনিম জুমা (ডানে)।
ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার থেকে জাবের, জুমাসহ ৬ শীর্ষ কর্মকর্তার পদত্যাগ: নেপথ্যে কী?
ন্যাশনাল ডেস্ক | GenZ Frontier | ১১ জুলাই, ২০২৬
ঢাকা — ট্রাস্ট গঠন ও ওয়ারিশ-সংক্রান্ত জটিলতা এবং অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের জেরে 'ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার'-এর শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে একযোগে পদত্যাগ করেছেন প্রতিষ্ঠাকালীন নির্বাহী পরিচালক ও বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল জাবের এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট (ডাকসুর সাবেক নেত্রী) ফাতিমা তাসনিম জুমাসহ ৬ শীর্ষ কর্মকর্তা।
গত বুধবার (৮ জুলাই) রাতে তারা নিজ নিজ ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দীর্ঘ স্ট্যাটাসের মাধ্যমে এই পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদির প্রতিষ্ঠিত এই সাংস্কৃতিক সংগঠনটির শীর্ষ পর্যায়ের এমন আকস্মিক পদত্যাগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। একই সাথে শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে আসা পাল্টা বিবৃতিতে ঘটনাটি নতুন মোড় নিয়েছে।
breking news
পদত্যাগের নেপথ্য: ট্রাস্ট ও ওয়ারিশ জটিলতা
জানা যায়, ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যুর পর সংগঠনটির পরিচালনা নিয়ে জটিলতার সূত্রপাত হয়। শহীদ ওসমান হাদি জীবিত থাকাকালীন জনগণের অর্থায়নে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানটিকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক 'ট্রাস্ট'-এর অধীনে নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু শাহাদাত বরণের কারণে তিনি সেই কাজ সম্পন্ন করে যেতে পারেননি।
পদত্যাগকারী নেতাদের দাবি, তার মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও পরিচালনার অধিকার নিয়ে তার উত্তরাধিকারীদের (ওয়ারিশ) পক্ষ থেকে দাবি তোলা হয়। দীর্ঘ ছয় মাস ধরে এর সমাধানের চেষ্টা করা হলেও পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল আকার ধারণ করে।
জাবের ও জুমার ফেসবুক বার্তা
আব্দুল্লাহ আল জাবের তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে হতাশা প্রকাশ করে জানান:
"আল্লাহ তায়ালা শহীদ ওসমান হাদীকে যে সম্মান দিয়েছেন, সেই সম্মানের স্বার্থে, তার ওয়ারিশদের দাবির প্রেক্ষিতে ও সমস্ত দলিল-দস্তাবেজ সাপেক্ষে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার দাবিকারীদের নিকট হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত ছয় মাস ধরে ওয়ারিশ-সংক্রান্ত বিষয়টির সমাধানের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি।"
অন্যদিকে, ফাতিমা তাসনিম জুমা তার পোস্টে সংগঠনটির কাঠামোগত পরিবর্তনের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, বাংলাদেশপন্থী সংস্কৃতির প্রসারের স্বার্থে তিনি ইনকিলাবে যুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু সংগঠনটি ধীরে ধীরে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের গণ্ডি পেরিয়ে রাজনৈতিক পরিসরে প্রবেশ করতে শুরু করায় তিনি মানসিকভাবে অস্বস্তিতে ছিলেন।
"ওয়ারিশ-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে নানা অপপ্রচার, কুৎসা ও আইনি জটিলতা তৈরি করা হয়েছে। এসব কারণে মানসিকভাবে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে ছিলাম। তবে খুব দ্রুতই আমাদের দায়িত্বকালীন সময়ের সেন্টারের সব আর্থিক হিসাব জনসমুক্ষে প্রকাশ করা হবে," যোগ করেন জুমা।
একসাথে পদত্যাগ করলেন যারা
চেয়ারম্যান এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট ছাড়াও পদত্যাগ করেছেন সংগঠনটির আরও চারজন শীর্ষ কর্মকর্তা। তারা হলেন: ১. সালাহউদ্দিন শুভ (সভাপতি) ২. ফাহিম আব্দুল্লাহ (ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক) ৩. মো. রায়হান (অর্থ ব্যবস্থাপনা পরিচালক) ৪. হাবিবুল্লাহ মিসবাহ (উপ-নির্বাহী পরিচালক)
জানা গেছে, কালচারাল সেন্টার থেকে পদত্যাগ করলেও জাবের ও জুমাসহ অন্যান্যরা মূল সংগঠন 'ইনকিলাব মঞ্চ'-এর সাথে যুক্ত থাকবেন এবং তাদের সংগ্রাম অব্যাহত রাখবেন।
শহীদ পরিবারের তীব্র প্রতিবাদ ও পাল্টা দাবি
পদত্যাগের কারণ হিসেবে জাবের এবং জুমারা 'ওয়ারিশদের দাবি'র কথা উল্লেখ করলেও, শহীদ ওসমান হাদির পরিবার এই দাবি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে। ওসমানের বোন মাসুমা হাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে একটি পাল্টা পোস্ট দিয়েছেন।
তিনি স্পষ্ট করেন যে, ইসলামী উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী ওসমান হাদির উত্তরাধিকারী কেবল তার মা, স্ত্রী ও সন্তান। তাদের মধ্যে কেউ কখনো কালচারাল সেন্টারের দায়িত্ব বা পদবি দাবি করেনি।
মাসুমা হাদি তার পোস্টে বলেন:
"পরিবারের কেউ কোনো পদ-পদবি চায়নি। আমরা শুধু শহীদের কবর সংরক্ষণ, একটি স্থায়ী নামফলক স্থাপন এবং তার আদর্শ যেন অক্ষুণ্ন থাকে, সেটাই চেয়েছিলাম। ওয়ারিশদের দাবির বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং পরিবারের নাম ব্যবহার করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে শহীদের পরিবারকে অযথা বিতর্কের মুখে ফেলা হচ্ছে।"
উভয় পক্ষের এমন পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের পর ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের ভবিষ্যৎ পরিচালনা কার হাতে ন্যাস্ত হবে এবং জনগণের টাকায় গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা কীভাবে নিশ্চিত হবে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার থেকে কারা পদত্যাগ করেছেন? সংগঠনটির চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল জাবের, ভাইস প্রেসিডেন্ট ফাতিমা তাসনিম জুমা, সভাপতি সালাহউদ্দিন শুভসহ মোট ৬ জন শীর্ষ কর্মকর্তা পদত্যাগ করেছেন।
২. পদত্যাগের মূল কারণ হিসেবে কী বলা হয়েছে? পদত্যাগকারী কর্মকর্তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠাতা শহীদ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর তার ওয়ারিশদের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানের ওপর দাবি জানানো হয় এবং এ সংক্রান্ত জটিলতার কারণেই তারা দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
৩. শহীদ ওসমানের পরিবার এ বিষয়ে কী বলছে? শহীদ ওসমানের বোন মাসুমা হাদি এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছেন, পরিবারের কেউ প্রতিষ্ঠানের কোনো পদ বা মালিকানা চায়নি। তারা কেবল শহীদের স্মৃতি সংরক্ষণ ও আদর্শ রক্ষার দাবি জানিয়েছিলেন।
৪. পদত্যাগের পর আর্থিক হিসাবের কী হবে? সদ্য পদত্যাগকারী ভাইস প্রেসিডেন্ট ফাতিমা তাসনিম জুমা জানিয়েছেন, খুব শিগগিরই তাদের দায়িত্বকালীন সময়ের সকল আর্থিক আয়-ব্যয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব জনসমুক্ষে প্রকাশ করা হবে।
#InqilabCulturalCenter #AbdullahAlJaber #FatimaTasnimJuma #BangladeshCulture #GenZFrontierNews
